বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:৪৭ অপরাহ্ন
ইউনিভার্সেল নিউজ : ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক আহমেদ সিদ্দিক, র্যাব-৮-এর তৎকালীন প্রধান মেজর রাশেদ, বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা জিয়াউল আহসানসহ নয়জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে অভিযোগ দায়ের করেছেন এক যুগেরও বেশি সময় আগে র্যাবের গুলিতে পা হারানো ঝালকাঠির লিমন হোসেন। এছাড়া অজ্ঞাতনামা চার থেকে পাঁচজন আসামি করা হয়েছে। মঙ্গলবার (১২ নভেম্বর) দুপুরে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে তিনি সশরীরে এসে এই অভিযোগ দাখিল করেন । অভিযোগ দায়েরের পর সাংবাদিকদের লিমন হোসেন বলেন, ‘২০১১ সালে ফ্যাসিস্ট স্বৈরাচারী সরকারের সন্ত্রাসী র্যাব বাহিনী দ্বারা আমি নির্যাতিত হয়েছিলাম। নির্যাতনের এক পর্যায়ে আমার শার্টের কলারে ধরে পায়ে গুলি করে। এর ফলে আমার একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করি আমি।’
গুলিতে পা হারানো লিমন বলেন, ‘ফ্যাসিবাদী শেখ হাসিনার শাসনামলে চাইলেও সব অপরাধীকে আসামি করা সম্ভব হয়নি। তবে সবাইকে আসামি করতে চেয়েছিলাম, কিন্তু অনেক বাধা-বিপত্তি ও হুমকি ছিল। যাঁদের আসামি করতে পারিনি তার মধ্যে অন্যতম তারিক আহমেদ সিদ্দিক, র্যাব-৮ এর তৎকালীন ক্যাম্প কমান্ডার মেজর রাশেদ ও এনটিএমসির সাবেক মহাপরিচালক জিয়াউল আহসান।’
লিমন বলেন, আমাকে তখন এমন বানানো হয়েছিল যে আমি অনেক বড় সন্ত্রাসী ছিলাম। শুধু র্যাব নয়, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী (প্রয়াত) সাহারা খাতুন সে সময় ফোন করে বলেন, আমাকে যেন পঙ্গু হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া না হয়। গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় আমাকে হাসপাতাল থেকে বের করে দেয়। এবং আমাকে জেলে নিয়ে যাওয়া হয়। তারপর আমার জামিনের পর আমি যখন আবার হাসপাতালে আসি চিকিৎসার জন্য, তখন হাসপাতাল আমাকে চিকিৎসা করাবে না বলে দেয়। তখন ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী স্যার আমার চিকিৎসার দায়িত্ব নেন। পাশপাশি আমার পড়াশোনার দায়িত্ব নেয় গণস্বাস্থ্য ও প্রথম আলো। প্রথমে মানবাধিকার কমিশন আমাকে নানাভাবে সাপোর্ট করেছিল। কিন্তু পরে আমি জানি না কেন জানি উনি হয়তো চাপে পড়ে আমার বিষয়টি মীমাংসার জন্য জোর দেন। যেটা আসলে খুবই দুঃখজনক ছিল। কারণ এই ঘটনা কোনো মীমাংসার নয়। আমার ওপর নির্মম নির্যাতন করে আমার একটা পা কেটে ফেলে সারা জীবনের জন্য পঙ্গু করে দিয়েছে।
র্যাবকে ‘সন্ত্রাসী’ সংগঠন হিসেবে উল্লেখ করে এই বাহিনীর বিলুপ্তি দাবি করেন লিমন হোসেন। দ্রুত বিচার দাবি করে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আসামিদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করতে হবে। তাদের আইনের আওতায় এনে সঠিক বিচার করতে হবে।
২০১১ সালে র্যাবের গুলিতে পা হারিয়ে র্যাবের বিরুদ্ধে মামলা করায় ৮-১০ বছর তাঁরা গ্রামের বাড়িতে থাকতে পারেননি বলে জানান লিমন। তিনি বলেন, ‘১৩ বছর অনেক আকুতি-মিনতি করেছি ন্যায়বিচারের জন্য। তখন ন্যায়বিচার তো পাইনি, বরং অনেক হয়রানির শিকার হতে হয়েছিল। আমি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দ্বারস্থ হয়েছি ন্যায়বিচারের পাওয়ার জন্য।’
আসলে পায়ের বিনিময়ে কোনো ক্ষতিপূরণ যথোপযুক্ত হয় না উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারপরও দেশের আইন অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ চান। ওই সময় হাইকোর্ট থেকে একটি রায় দেওয়া হয়েছিল যে, লিমনের দায়ভার রাষ্ট্রকে নিতে হবে। তখন হাইকোর্টের আদেশও রাষ্ট্র মানেনি। তখন সরকার নিজেকে মনে করতো সব কিছুর ঊর্ধ্বে।
লিমন বলেন, আমাকে যখন গুলি করা হয় আমার মায়ের একটা দাবি ছিল। তিনি র্যাব-৮-এ গিয়ে বলেছিলেন, আমার ছেলের চিকিৎসা করান এবং তার লেখাপড়ার দায়িত্ব নেন। কিন্তু র্যাব কোনোভাবে এই দায়িত্ব নেয়নি। সবসময় তাদের দাবি ছিল, লিমন সন্ত্রাসী। তবে গণস্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সংস্থার সাহায্যের মাধ্যমে আমি সুস্থ হয়েছি ও আমার পড়াশোনা সম্পন্ন করেছি।
তিনি বলেন, আমার এখন প্রথম চাওয়া হচ্ছে আমাকে যারা পঙ্গু করে দিয়েছে তাদের বিচার চাই। একটা সুষ্ঠু তদন্ত করে এর বিচার করা হোক।
লিমন বলেন, আমি এবং আমার পরিবার কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত ছিলাম না। পিবিআই তাদের এক রিপোর্টে বলেছিল, লিমন ভালো ছেলে। তবে তাকে র্যাব গুলি করেনি, কে বা কারা গুলি করেছে তা জানা নেই, এমন একটি প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল। ফ্যাসিবাদ চলে যাওয়ার পর পুরো রাষ্ট্রের ও আমার পরিবারের ট্রাইব্যুনালের প্রতি একটা আস্থা হয়েছে। তাই এই কারণে আমি আজ এখানে অভিযোগ দাখিল করেছি। আমি এখানে সুষ্ঠু বিচার পাবো।
প্রসঙ্গত, ঝালকাঠির রাজাপুরের সাতুরিয়া গ্রামের লিমন হোসেন ২০১১ সালের ২৩ মার্চ মাঠ থেকে গরু আনতে গিয়ে র্যাবের গুলিতে পা হারান। ‘সন্ত্রাসী’ সন্দেহে আটক করার পর তার পায়ে গুলি করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা করে র্যাব। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আদেশে ২০১৩ সালে তাঁকে দুটি মামলা থেকেই অব্যাহতি দেওয়া হয়।
লিমন সে বছর উচ্চ মাধ্যমিক (এইচএসসি) পরীক্ষার্থী ছিলেন। পরীক্ষা শুরুর ১২ দিন আগে এ ঘটনা ঘটে। তখন লিমনের বয়স ছিল ১৬ বছর। তাকে পঙ্গু হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচার করে বাঁ পা হাঁটুর নিচ পর্যন্ত থেকে কেটে ফেলেন। র্যাবের গুলিতে লিমনের পা হারানো ইস্যুতে পরবর্তীতে কয়েক বছর ধরে টানা সরব ছিল মানবাধিকার সংগঠনগুলো। তারা অভিযুক্ত র্যাব সদস্যদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়ে আসছিল। তবে দমে যাননি লিমন হোসেন। আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষে এখন সাভারের গণ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন তিনি।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply