বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:৩৪ অপরাহ্ন
নিউজ ডেস্ক, ইউনিভার্সেল নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম : কথিত হিজরতের উদ্দেশ্যে পাহাড়ে বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে সমন্বয় করে নব্য উগ্রবাদী জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্কিয়া প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্কিয়া’র প্রধান শামীন মাহফুজের নেতৃত্বে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে কয়েকটি জঙ্গি সংগঠনের সদস্যরা। তারা বান্দরবান পাহাড়ি এলাকায় একত্রিত হয়ে সামরিক প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। এই জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে পাহাড়ি বিচ্ছিন্নবাদীদের সঙ্গেও যোগাযোগ রয়েছে। তারা সমন্বয় করে জঙ্গিবাদে উদ্বুদ্ধ নতুন সদস্যদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলো। বৃহস্পতিবার (২৭ অক্টোবর) সকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার (সিটিটিসি) মো. আসাদুজ্জামান এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান। রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসি’র সিটি ইনভেস্টিগেশন বিভাগের উপ-পুলিশ কমিশনার এসএম নাজমুল হক উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে বুধবার রাজধানীর রাজধানীর ডেমরা এলাকা থেকে উগ্রবাদী জঙ্গি সংগঠনের পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করে টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিটের (সিটিটিসি) সিটি ইনভেস্টিগেশন বিভাগ। গ্রেফতারকৃতরা হলো- আব্দুল্লাহ (২২), তাজুল ইসলাম (৩৩), জিয়াউদ্দিন (৩৭), হাবিবুবুল্লাহ (১৯) ও মাহামুদুল হাসান (১৮)। এসময় তাদের কাছ থেকে তিনটি মোবাইল ফোন, অন্যান্য জিনিস উদ্ধার করা হয়। মো. আসাদুজ্জামান বলেন, এরআগে গ্রেফতার ডাক্তার শাকির বিন ওয়ালী এই সম্মিলিত জঙ্গি সংগঠনের দাওয়া বিভাগের প্রধান ছিলেন। তিনি কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজে লেখাপড়া করার সময় এই মতাদর্শে জড়িয়ে পরেন। পরে শাকির এই সংগঠনের সদস্যদের নিয়মিত চিকিৎসাও দিয়ে আসছিলেন।
সিটিটিসি প্রধান বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃতরা জানায়, তারা সবাই নব্য উগ্রবাদী জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্কিয়া’র সক্রিয় সদস্য। এছাড়া গ্রেফতার হাবিবুবুল্লাহ ও মাহামুদুল হাসান ওই সংগঠনের আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে জিহাদের প্রশিক্ষণ নেওয়ার জন্য কথিত হিজরতের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়। তিনি বলেন, জঙ্গি সংগঠনের সদস্য আবদুল্লাহ, তাজুল ইসলাম ও জিয়াউদ্দিন সংগঠনের সদস্য হিসেবে কথিত হিজরতের উদ্দেশ্যে ঘর ছেড়ে আসা নতুন সদস্যদের সাময়িক বাসস্থানের ব্যবস্থা করতো। এছাড়া ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গা থেকে হিজরত করা তরুণদের রিসিভ করে ওই আসামিরা আব্দুল্লাহর বাসায় নিয়ে যেতো এবং তাদের উগ্রবাদী ধারণায় উদ্বুদ্ধ করতো। পরবর্তীতে তাদের ট্রেনিংয়ে পাঠানোর ব্যবস্থা করতো তারা।
সম্প্রতি কুমিল্লা থেকে সাত জন তরুণ নিখোঁজ হওয়ার পর দেশব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি হলে সিটিটিসি ছায়া তদন্ত শুরু করে। কুমিল্লা থেকে হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হওয়া আবরারুল হককে শনাক্ত করে রাজধানীর মগবাজার এলাকা থেকে গত ১৩ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার করা হয়। আবরারুল হকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দেশব্যাপী নিখোঁজের চাঞ্চল্যকর ঘটনার সঙ্গে জড়িত সংগঠনের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় জঙ্গি ডাক্তার শাকির বিন ওয়ালীর বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়। পরবর্তীতে রামপুরার হাজীপাড়া এলাকা থেকে ডাক্তার শাকির বিন ওয়ালীকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারকৃত ডাক্তার শাকির বিন ওয়ালী জানান, তিনি জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্কিয়া’র দাওয়া বিভাগের প্রধান। তিনি সংগঠনের দাওয়াতি বিভাগে কাজ করতেন এবং পাহাড়ে সামরিক প্রশিক্ষণের সময় কোনও জঙ্গি সদস্য অসুস্থ হলে তার চিকিৎসা করতেন। কোনও সদস্য হামলার শিকার হলে প্রাথমিক চিকিৎসা কীভাবে করতে হবে সে বিষয়েও প্রশিক্ষণ দিতেন। সমতলে থাকাকালেও তিনি যেসব জঙ্গি সদস্য প্রশিক্ষণ গ্রহণের সময় অসুস্থ হতেন তাদের গোপন চ্যাটে আলাপ করে চিকিৎসা করতেন। ডাক্তার শাকির বিন ওয়ালী পাহাড়ি জঙ্গি ক্যাম্পে এক মাসের বেশি সময় অবস্থান করেছেন। প্রতিমাসে একবার তিনি পাহাড়ি ক্যাম্প পরিদর্শন করতেন। এর পাশাপাশি জঙ্গি নেতা শামীম মাহফুজের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতেন।
ক্যাম্পে তিন ভাগে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। প্রথম ভাগে পাহাড়ের ক্যাম্পে শারীরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। দ্বিতীয়ভাগে যুদ্ধ কৌশল যেখানে ডামি অস্ত্র দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হতো। তৃতীয় ধাপে পেট্রলিং শেখানো হতো। ট্রেনিং ক্যাম্পটিতে শামীম মাহফুজের পাশাপাশি তমাল, রনবীর, রাকিব, ডাক্তার শাকির বিন ওয়ালী যাতায়াত করতেন এবং সার্বিক বিষয় তদারকি করতেন। ক্যাম্প থেকে কেউ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে চাইলে তারা বিদ্রোহীদের হাত, পা, চোখ বেঁধে বন্দি করে রাখতেন।
জঙ্গিবাদের জন্য সদস্য রিক্রুটমেন্ট, অর্থ সংগ্রহ, সশস্ত্র সামরিক ট্রেনিং, আধুনিক অস্ত্র কেনাসহ বিশাল জঙ্গি বাহিনী গঠন করাই ছিল তাদের উদ্দেশ্য। এসব উদ্দেশ্য পূরণ করতে তারা দেশব্যাপী ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের অক্টোবর পর্যন্ত ৭০ থেকে ৮০ জন যুবককে এই সংগঠনের সদস্য করেছেন। সংগঠনের উদ্দেশ্যে ছিল পাহাড়ে তাদের শক্ত অবস্থান তৈরি, নিরাপদ সামরিক ট্রেনিং, সংগঠনের উগ্রবাদী উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে দেশে নাশকতা সৃষ্টির মাধ্যমে উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করে। পরে নিরাপদ আশ্রয়ে ফিরে যাওয়া। গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী রাজধানীর ডেমরা থানায় একটি মামলা করা হয়েছে।
সম্প্রতি দুর্গম পাহাড়ে বাড়িছাড়া কিছু তরুণ জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। নতুন জঙ্গি সংগঠন ‘জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া’কে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ‘কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্ট’ (কেএনএফ) নামে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী। কয়েক মাস আগে ঘরছাড়া বেশ কয়েকজন তরুণ পাহাড়ে গিয়ে কেএনএফ’র কাছে জঙ্গি প্রশিক্ষণ নিচ্ছে বলে জানায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। গত ১৩ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা থেকে হিজরতের উদ্দেশ্যে বের হওয়া আবরুর হক আবরারকে (১৮) গ্রেফতার করে কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম ইউনিট (সিটিটিসি)। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে, পরদিন রামপুরা এলাকা থেকে সদ্য এমবিবিএস পাস করা শাকির বিন ওয়ালী নামে এক চিকিৎসককে গ্রেফতার করে সিটিটিসি। শাকির বিন ওয়ালী হলেন নতুন জঙ্গি সংগঠনের দাওয়া বিভাগের প্রধান।
নতুন জঙ্গি সংগঠন জামাতুল আনসার ফিল হিন্দাল শারক্বীয়া। ২০১৭ সাল থেকে এ সংগঠন তৈরির কাজ চলে। সদস্যদের প্রশিক্ষণ শুরু হয় পার্বত্য অঞ্চলে। সম্প্রতি সংগঠনটির বেশ কয়েকজন সদস্যকে গ্রেফতার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সংগঠন তৈরির পুরো পরিকল্পনাই হয় কারাগারের ভেতর। শাকের বিন ওয়ালি প্রতি মাসে একবার পার্বত্য বান্দরবান এলাকায় নতুন জঙ্গি সংগঠনটির প্রশিক্ষণ শিবিরে গিয়ে অসুস্থ সদস্য বা কেউ কোনো রোগে আক্রান্ত হলে চিকিৎসা দিতেন। ঢাকা অবস্থানের সময় তিনি সংগঠনটিন প্রধান শামিন মাহফুজ ওরফে স্যারের সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ রাখতেন। ফোনে সদস্যদের অসুস্থতার লক্ষণ শুনে ব্যবস্থাপত্র পাঠাতেন শাকের। এছাড়া জঙ্গি সংগঠনটির সঙ্গে প্রশিক্ষণ শিবিরে থাকা পাহাড়ি সন্ত্রাসী সংগঠন কুকি চিনের সদস্যরা আহত হলে তাদেরও সেখানে গিয়ে চিকিৎসা দিতেন। শাকেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করে মহসিন এলায়েস ওরফে রিয়েল নামে আরও এক ব্যক্তির নাম পাওয়া যায়। তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে নতুন জঙ্গি সংগঠনটির একজন শীর্ষ নেতা হিসেবে কাজ শুরু করেন। একটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানে উচ্চ বেতনে চাকরিও করতেন তিনি। ডাক্তার শাকের দুদিন আগে আদালতে জবানবন্দি দিয়েছেন। সেখান থেকে জানা গেছে, নতুন সংগঠনটির প্রথম আমির মাইনুল ইসলাম ওরফে রক্সি। ২০২১ সালের আগ পর্যন্ত তিনি এ পদে দায়িত্ব পালন করেন। একই বছর সিটিসিটি তাকে গ্রেফতার করে। তাকে সম্প্রতি রিমান্ডে নিয়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে বলে জানান সিটিটিসি প্রধান।
মো. আসাদুজ্জামান বলেন, শামিন মাহফুজ ওরফে স্যার নামে এক ব্যক্তি সংগঠনের মূল মাস্টার মাইন্ড। ২০১৪ সালে স্যার গ্রেফতার হন ডিবি’র হাতে। ২০১৫ সালেও একবার রক্সি গ্রেফতার হয়েছিলেন। দুজনই কারাগার থাকা অবস্থায় ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি আবু সাঈদের সান্নিধ্য পান। কারাগারের অভ্যন্তরেই তিনজন বিভিন্ন আলাপ-আলোচনায় নতুন সংগঠনটি তৈরির ব্যাপারে একমত হন। পরে পরিকল্পনা সাজান। রক্সি ও শামিন জেল থেকে বের হয়ে জঙ্গিদের নিয়ে শক্তিশালী একটি সংগঠন গড়ার কাজ শুরু করেন। যার ধারাবাহিকতায় সংগঠনের সদস্যদের প্রশিক্ষণ ও নিরাপত্তার জন্য পাহাড়ি এলাকায় ক্যাম্পের সন্ধান শুরু করা হয়।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply