বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:৪৮ অপরাহ্ন
ইউনিভার্সেল নিউজ : বরিশালে বন্দুকযুদ্ধে নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসী ফারুক আহমেদ ওরফে পানামা ফারুকের অপরাধ জগতের সঙ্গী, তারই ছোট ভাই নানা অপকর্মের হোতা মনা আহম্মেদ ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের নাম ভাঙ্গিয়ে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ফের বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগে তার কোন পদপদবী না থাকলেও ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি শামিম আহসানের ছত্রছায়ায় আ’লীগের সাইনবোর্ড ব্যবহার করেই সাম্প্রতিক সময়ে বাজার রোড, বাকলার মোড় সহ আশপাশ এলাকার সাধারন জনগণের মাঝে মূর্তিমান আতঙ্কে পরিণত হয়েছে। মনার গড়ে তোলা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বাহিনীর ভয়ে মুখ খুলতে পারছে না শান্তিপ্রিয় নারী-পুরুষ। যেভাবে ত্রাসের রামরাজত্ব করে ব্যবসায়ী সহ বিভিন্ন শ্রেনী পেশার মানুষকে জিম্মিদশায় রেখেছিল তারই বড় ভাই বন্দুকযুদ্ধে নিহত পানামা ফারুক। অস্ত্র ব্যবসায়ী ভাইয়ের সহযোগীদের নিয়ে একই কায়দায় অপরাধ জগত দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মনা।
শনিবার (৮ জুলাই) সকাল ৯ টায় বরিশাল জিলা স্কুল মসজিদ গেটের সামনে বরিশাল জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সদস্য, শেখ রাসেল জাতীয় শিশু কিশোর পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক কার্যনির্বাহী সদস্য ও নগরীর ৮ নং ওয়ার্ড যুবলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক (ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক) রফিকুল ইসলাম খান রফির ওপর চড়াও হয়ে লাঞ্ছিত করে প্রাণনাশের হুমকি দেয় ত্রাস মনা। নবনির্বাচিত বরিশাল সিটি মেয়র আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ সহ দলীয় নেতাকর্মীরা টুঙ্গিপাড়া জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারতের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার প্রাক্কলে বাসের মধ্যে এই ঘটনা ঘটে। এ বিষয়ে যুবলীগ নেতা রফিকুল ইসলাম খান রফি বাদী হয়ে মনা ও তার সহযোগী বাপ্পী দাসকে অভিযুক্ত করে বরিশাল কোতয়ালী মডেল থানায় একটি অভিযোগ দিয়েছেন।
সাবেক ছাত্রলীগ নেতা রফি ইউনিভার্সেল নিউজকে বলেন, বরিশাল সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন (২০২৩) আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবুল খায়ের আবদুল্লাহ ‘র ৮ নং ওয়ার্ডের নির্বাচনী উঠান বৈঠকে ওয়ার্ড যুবলীগ সভাপতি শামিম আহসান ও সন্ত্রাসী মনা কর্তৃক অন্য ওয়ার্ডের ব্যবসায়ী ও জেলা বিএনপি’র নেতাকে স্টেজে বক্তৃতার সুযোগ দেওয়ার বিরোধিতা করায় সন্ত্রাসী মনা তখন আমাকে দেখে নেয়ার হুমকি দেয়। এছাড়া ৮ নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে দুইজন প্রার্থীর একজন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগ এর সহ-সভাপতি এবং অপরজন মহানগর বিএনপির সাবেক নেতা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। এই সন্ত্রাসী মনা কাউন্সিলর প্রার্থী বিএনপি নেতার পক্ষ করায় ৮ নং ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের মেয়র নির্বাচনী কার্যালয়ে বসে প্রায়ই আমাকে সহ কাউন্সিলর প্রার্থী ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সহ-সভাপতি অরুণ দাস এর সমর্থকদের আজেবাজে ভাষায় গালিগালাজ এমনি স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের অফিস থেকে বের করে দেয়ার হুমকি ধামকি পর্যন্ত দেয়।
যুবলীগ নেতা রফিকুল ইসলাম খান রফি বলেন, মনা ও পানামা বাহিনীর সদস্যদের উপরোক্ত অপকর্মের প্রতিবাদ করায় তারা আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়। এরইধারাবাহিকতায় নবনির্বাচিত মেয়রের নেতৃত্বে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর মাজার জিয়ারতে যাওয়ার জন্য ওয়ার্ডে তৈরি করা তালিকায় মনার নাম ৫ নম্বরে থাকার অজুহাত তুলে ওয়ার্ড যুবলীগের সভাপতি শামিম আহসানের সামনে মনা ও তার সহযোগী বাপ্পী দাস আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে লাঞ্ছিত করে প্রাণনাশের হুমকি দেয়।
এ নিয়ে মনার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগের বিষয়ে পরবর্তীতে পুলিশের এসআই সাইদুর যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেয় রফি খানকে। এ বিষয়টি নবনির্বাচিত মেয়র খোকন সেরনিয়াবাতের নখদর্পনে দেওয়া হয়েছে বলে ইউনিভার্সেল নিউজকে জানিয়েছেন রফিকুল ইসলাম খান রফি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালীন সময়ে পানামা ফারুক বরিশাল শহরে ব্যাপক সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের জন্ম দেয়। বাজার রোডের ইয়াকুব আলী বেপারীর ছেলে সে। নগরীর উত্তরাংশ বাজার রোড-আমানতগঞ্জ এলাকায় ভয়ঙ্কর ত্রাস হিসেবে আর্বিভূত হয়েছিলেন ফারুক। তার নামে গড়ে ওঠে অস্ত্রধারী পানামা বাহিনী। ওই সময় তার আরেক ভাই মাহাবুবুর রহমান ছক্কু তার সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে কাজ করত। যা দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিভিন্ন দেশেও পানামা ফারুকের অস্ত্র ব্যবসা, মাদক বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সহ নানা অপরাধের বিষয়টি ছড়িয়ে পড়ে। পানামার অপরাধ জগতের বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ হলে তেলেবেগুনে জ্বলে উঠে। এরপর বরিশাল প্রেসক্লাব বর্তমানে শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত বরিশাল প্রেসক্লাবে পানামার নেতৃত্বে হামলা চালিয়ে চরম বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। এবং তার অপরাধ জগতের সার্বক্ষনিক সঙ্গী ছিল তার ভাই ছক্কু ও মনা। এরফলে তৎকালীন সময়ে আওয়ামী লীগ সরকারের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুন্ন হয়।
২০০১ সালে ক্ষমতার পটপরিবর্তনে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসলে রাতের আধারে পানামা ফারুক ও তার সহধর ছক্কু, মনাসহ পুরো পরিবার আত্মগোপনে চলে যায়। পানামা ও ছক্কু ভারতসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আত্মগোপন করে থাকে। বর্তমানে ছক্কু ইটালীতে আত্মগোপন করে আছে।
২০০৮ সালে মহাজোট সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০০৯ সালের ৪ অক্টােবর পানামা আদালতে আত্মসমর্পণ করে। এরপর জামিন নিয়ে বরিশাল নগরীর বাজার রোডের নিজ বাসায় পরিবার ও ছোট ভাই মনা সহ বসবাস শুরু করেন পানামা ফারুক। তৎকালীন সময়ে পানামা ও তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে বরিশালে ফিরে স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা তুলে ভুরিভোজের আয়োজন করে এলাকায় মূর্তিমান আতঙ্ক হিসেবে পূণরায় জানান দিয়েছিল। ২০১৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি র্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হন শীর্ষ সন্ত্রাসী ফারুক আহমেদ ওরফে পানামা ফারুক।
অপরদিকে, বন্দুকযুদ্ধে নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসী পানামা ফারুক নিহত হওয়ার পর তার অস্ত্র ব্যবসায়ের পুরো নিয়ন্ত্রণে নেয় তার ছোট ভাই মনা আহম্মেদ। জনমনে মূর্তিমান আতঙ্ক মনা আহম্মেদ একেক সময় একেক রাজনৈতিক নেতার নাম ভাঙ্গিয়ে অপকর্ম করে পাড় পেয়ে যাচ্ছে। এই মনা অস্ত্র, মাদক সহ বিভিন্ন মামলায় একাধিকবার কারাগারে গেছেন। তিনি সাজাও ভোগ করেছেন।
একসময়ে এই মনা বরিশাল সিটি মেয়র ও নগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ’র নাম ও ছবি সম্বলিত এলাকায় ব্যানার করে প্রচার চালিয়েছিল। পরে মনা ও তার সহযোগীদের মাদক ব্যবসায়ে সংশ্লিষ্টতা সহ নানা অপরাধ কর্মকাণ্ডের বিষয়ে জানতে পেরে সাদিক আব্দুল্লাহ তাদের ব্যাপারে কঠোর অবস্থান নেয়। ফলশ্রুতিতে মহানগর আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একজন নেতার কাছ থেকে প্রাপ্ত আর্থিক সুবিধাও বন্ধ হয়ে যায়।
এরপর মনা ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা বরিশাল সদর আসনের সাংসদ কর্নেল (অব) জাহিদ ফারুক শামিম এর নাম ব্যবহার করে এলাকায় ব্যানার করে প্রচার চালায়। এবং ২০২৩ মেয়র নির্বাচনের সময় নৌকার মেয়র প্রার্থী খোকন সেরনিয়াবাত এর নাম ব্যবহার ব্যানার-ফেস্টুনের মাধ্যমে প্রচার চালায়। একইসঙ্গে মনা তার অপকর্মের হাতিয়ার হিসেবে সোশ্যাল মিডিয়া ফেসবুক ব্যবহার করে আসছে। তার তিনটি ফেসবুক এ্যাকাউন্টের একটিতে মেয়র সেরনিয়াবাত সাদিক আব্দুল্লাহ’র আরেকটিতে সাংসদ কর্নেল (অব:) জাহিদ ফারুক শামীম এর এবং অন্যটিতে নবনির্বাচিত মেয়র আবুল খায়ের আব্দুল্লাহ’র প্রচার চালিয়ে আসার তথ্য পাওয়া গেছে। তার ভিন্ন ভিন্ন ফেসবুক এ্যাকাউন্টে একেক সময় যখন যে নেতার নাম ভাঙ্গিয়ে অপকর্ম করার প্রয়োজন হতো তখন সেই নেতার ধারাবাহিক প্রচারণা চালাতো।
এসব প্রসঙ্গে মনা আহম্মেদের ব্যক্তিগত সেলফোনে একাধিকবার ডায়াল করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
সবমিলিয়ে আওয়ামী লীগের নাম ব্যবহার করে মনা এবং তার সহযোগীরা একের এক অপরাধের পাহাড় জন্ম দিচ্ছে। এরফলে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের সুনাম ক্ষুন্ন হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক ত্যাগী নেতা। বন্দুকযুদ্ধে নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসী পানামা ফারুকের ছোট ভাই মনার নেতৃত্বে পূণরায় পানামা বাহিনী সংগঠিত হওয়ায় এলাকার ব্যবসায়ী সহ শান্তিপ্রিয় বাসিন্দারা চরম আতঙ্কের মধ্যে রয়েছে। শান্তিপ্রিয় মানুষ এদের অত্যাচার ও জিম্মিদশা থেকে মুক্তি চেয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর আশু দৃষ্টি কামনা করেছেন।
বি:দ্র : বন্দুকযুদ্ধে নিহত শীর্ষ সন্ত্রাসী পানামা ফারুকের ছোট ভাই মনার অন্তহীন অপকর্মের ফিরিস্তি জানতে পাঠক চোখ রাখুন।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply