বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ১২:৪৮ অপরাহ্ন
ইউনিভার্সেল নিউজ : দেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে বরিশাল দক্ষিণ জেলা যুবদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক উলফাত রানা রুবেলের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী বাহিনীর চাঁদাবাজি টাকার ভাগবাটোয়ারাকে কেন্দ্র করে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাতেই নিজ দলের কর্মী সুরুজ গাজী হত্যার শিকার হন। ধার্যকৃত মোটা অঙ্কের চাঁদার টাকার জন্য গত ২ মার্চ বিকেলে নগরীর কাউনিয়া হাউজিং শেরে বাংলা স্কুলের সামনে থেকে গাওসার এলাকার বাসিন্দা স্বেচ্ছাসেবক দলের ৩ নং ওয়ার্ডের আহবায়ক ব্যবসায়ী শাহিন সরদারকে চক্রের সদস্যরা ঘিরে ধরে ব্যাপক নির্যাতন ও তার কাছে থাকা নগদ এক লাখ টাকা লুটে নেয়। এরপর ব্যবসায়ীকে অপহরণ করে মরকখোলার পুল এলাকায় নিয়ে ছেড়ে দেয়। এই লুটে নেওয়া চাঁদার টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়ে সংঘবদ্ধ চক্রের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে বাকবিতণ্ডা, হাতাহাতি ও ধারালো অস্ত্রের আঘাতে সংঘাতে রক্তপাত ঘটে। এতে যুবদল নেতা রুবেলের অনুগত সন্ত্রাসীদের আঘাতে সুরুজ গাজী সহ কয়েক জন গুরুতর জখম হন। পরবর্তীতে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সুরুজ মারা যান। মূলত : সুরুজ গাজী হত্যায় প্রত্যক্ষ জড়িত উলফাত রানা রুবেল ও তার আস্তাভাজন সহযোগীদের রক্ষায় হত্যাটি ভিন্নখাতে প্রভাহিত করতে চাঁদাবাজ-সন্ত্রাসী বাহিনীর টার্গেটে থাকা স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা শাহিন সরদার ও ৩ নং ওয়ার্ড মহিলা দলের সভাপতি শাবানা দম্পত্তি পরিবারের সদস্যদের ফাঁসিয়ে দেয়। প্রকাশ্যে ঘোষণা দিয়ে বলা হয়- সুরুজ হত্যার সঙ্গে শাহিন সরদারের পরিবার জড়িত।
গত বছরের ১ সেপ্টেম্বর কাউনিয়া হাউজিং এলাকার কেতাব আলী হাওলাদারের কন্যা নাছিমা বেগমের কাছ থেকে ভাঙ্গারীর গোডাউন ভাড়া নেন শাহিন সরদার। এরআগে ওই গোডাউন ভাড়া নিয়েছিলেন হোসনাবাদ এলাকার সাদ্দাম নামের যুবক। শাহিন সরদার প্রকৃত মালিক নাছিমার কাছ থেকে গোডাউন ভাড়া নেওয়ার পর চাঁদাবাজ চক্রের প্রধান উলফাত রানা রুবেল তার কাছে ১২ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিল। কারণ হিসেবে রুবেল বলছে যে, এরআগে গোডাউন ভাড়া নেওয়া সাদ্দামের কাছে বার লাখ টাকা পাওনা রয়েছে। সাদ্দামের কাছে পাওনা টাকা শাহিন সরদারকে দিতে হবে বলে হুমকিরসুরে জানিয়ে দেয় রুবেল। ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য, কোন ব্যক্তির কাছে যদি কেউ কোন পাওনা টাকা পায়, সেক্ষেত্রে অন্য আরেক জন্য ব্যক্তি কেন সেই টাকা দিবে। পরবর্তীতে বার লাখ টাকার জন্য বিভিন্নভাবে এই পরিবারকে হুমকি-ধামকি দিয়ে আসছিল। সর্বশেষ শাহিন সরদারের কাছ থেকে এক লাখ টাকা লুটে নেয়। ওই লুটে নেওয়া টাকার ভাগবাটোয়ারা নিয়েই নিজেদের মধ্যকার কোন্দলে নিহত হন সুরুজ গাজী।
ব্যবসায়ী শাহিন সরদারের স্ত্রী শাবানা বেগম ও পুত্র ইমরান হোসেন বাদী হয়ে বরিশাল আদালতে দায়েরকৃত পৃথক দুটি মামলার অভিযোগে চাঞ্চল্যকর এসব তথ্য উঠে এসেছে।
অভিযোগে বলা হয়, ২ মার্চ সন্ধ্য সাড়ে সাতটার দিকে শাহিন সরদারের বাসায় হামলা, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটে অংশ নেয় আওয়ামী লীগ শাসনামলে এলাকায় বিভিন্ন অন্যায় অপকর্মের হোতা শাহিন গাজী ও যুবদল নেতা উলফাত রানা রুবেলের নেতৃত্বে চক্রটি। একই দিন রাত ৯ টার দিকে ফের শাহিন সরদারের বসতঘর ও ভাড়াটিয়াদের বাসায় হামলা চালায়। ৩ মার্চ দিনভর বসত বাড়িতে লুটপাট চালিয়ে কোটি টাকার মালামাল লুটে নেয়। বিশেষ করে জমির দলিলপত্র, ব্যাংকের চেক বই সহ গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র নিয়ে যায়। রাত ৯ টার দিকে আবারো শাহিন-শাবানা দম্পত্তির বসত ঘরে আগুন দেয়। ১৮ মার্চ ব্যবসায়ী শাহিন-শাবানা দম্পত্তির ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ভাঙ্গারীর গোডাউনে লুটপাট চালায়। সেখান থেকে ৩০ লাখ টাকার মালামাল লুটে নেয় যুবদল নেতা উলফাত রানা রুবেলের নেতৃত্বে সন্ত্রাসীরা। শাহিন সরদারের ভাঙ্গারীর গোডাউন ও বসত বাড়িতে হামলা লুটপাটে অংশ নেওয়া অন্যান্য আসামিরা হলো বরিশালের বহুল আলোচিত মাদক সম্রাট দর্পনের ডাইভার হিসেবে পরিচিত মাদক কারবারী সুমন ওরফে বাবা সুমন, নয়ন ওরফে বাবা নয়ন, সবুজ গাজী, জাহিদ ওরফে মেকার জাহিদ, অপু ওরফে গাঁজা অপু, আমির, শাওন, শহিদ ওরফে মুরগী শহিদ, নাইম, রিনা বেগম, ফরিদা, আখি, তাইয়েবা, সাদিয়া, শানু বেগম, রাজিব ওরফে চাঁদাবাজ রাজিব, মানিক ওরফে চাঁদাবাজ মানিক, রবিন ওরফে চোরা রবিন, রাশেদ ওরফে গাঁজা রাশেদ, দোলন ওরফে টোকাই দোলন, ইয়াবা কারবারী শিপন ওরফে গাঁজা শিপন, ইব্রাহিম, সুমন ও জুয়েল।
ভুক্তভোগী ও ক্ষতগ্রস্ত পরিবারসহ স্থানীয় একাধিক সূত্রের ভাষ্য, ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান পরবর্তী যুবদল নেতা উলফাত রানা রুবেল নগরীর কাউনিয়া জানুকি সিং রোড, পিছনের স্কুল, হাউজিং ও আশপাশ এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করতে সংঘবদ্ধ চক্র গড়ে তোলে। ধারাবাহিক বেপরোয়াভাবে অসংখ্য বিতর্কের জন্ম দিয়ে আসলেও আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা দলের দায়িত্বশীল নেতারা যুবদল নেতা রুবেলের লাগাম টেনে ধরতে পারেনি। এলাকার শান্তিপ্রিয় নারী-পুরুষরা গড়ে ওঠা অস্ত্রধারী চক্রের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে পারছেন না। কেউ প্রতিবাদ করলে তাকে নানাভাবে ফাঁসিয়ে দিয়ে হেনস্থার শিকার হতে হচ্ছে। এ কারণে পুরো এলাকাবাসী এদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। এরা এলাকায় যেটা জাহির কিংবা ঘোষণা দিবে সেটাই নিয়মে বা সত্য বলে বিবেচিত।
উলফাত রানা রুবেলের গড়ে তোলা বাহিনীর সদস্যদের বেশিরভাগই মাদক ব্যবসায়ের সঙ্গে যুক্ত। অবাক করার মতো- নিজেকে রুবেল যুবদলের বড় মাপের নেতা দাবি করে আসলেও দেশের প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের পর কাউনিয়া পিছনের স্কুল লাগোয়া সোনালী আবাসের সামনে বিএনপির সাইনবোর্ড সেটে দিয়ে গড়ে তোলা ক্লাবে সবসময়ই বিচরণ করছে আওয়ামী লীগের চিহৃিত দোসররা। স্বৈরাচারের দোসরদের নিয়ে ক্লাবে সময় দিচ্ছেন যুবদল নেতা রুবেল। আবার যতসব অপকর্ম করতে এদের নিয়েই গড়েন সংঘবদ্ধ চক্র। তার সেকেন্ড ইন কমাণ্ড আওয়ামী লীগের চিহৃিত দোসর যুবলীগ কর্মী মানিক, আওয়ামী লীগের চিহৃিত দোসর ও মামা টুটুলের অনুসারী রাজিব, স্বৈরাচারের দোসর রিন্টু, শ্রমিক লীগের কর্মী শাহিন গাজী।
সূত্রগুলো বলছে, রুবেল চক্র ক্লাবে বসে চাঁদাবাজি, দখল সন্ত্রাস, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, ব্ল্যাকমেইল ও খুনের পরিকল্পনা করে আসছে। ক্লাবে বসে পতিতা ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণ করছে। অভিযোগ উঠেছে- রুবেলের পালিত বিভিন্ন পতিতা নারীদের ব্যবহার করে অর্থ বিত্ত ব্যক্তিদের টার্গেটের মাধ্যমে ব্ল্যাকমেইলের শিকার করা হয়। আবার কখনো শত্রুতা উদ্ধারে কিংবা কাউকে ফাঁসিয়ে দেওয়ার চক্রান্তে পতিতাদের ব্যবহার করা হয়।

দলীয় একাধিক সূত্রের ভাষ্য, আওয়ামী লীগের শাসনামলের ১৬ বছরে কোন ধরনের জুল জুলুমের শিকার হতে হয়নি রুবেলকে। বরংচ আওয়ামী লীগের দোসরদের সঙ্গে গভীর ঘনিষ্ঠতা বজায় রেখে আমোদ প্রমোদে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন। দলের দুর্দিনে তার কোন ধরণের অবদান না থাকলেও পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজের ব্যক্তি আখেড় গুজাতে অপরাধ সাম্রাজ্য চষে বেড়াচ্ছেন। এরফলে রুবেলদের কারণে দলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন দলের নিবেদিত কর্মী-সমর্থকরা।

এদিকে, সুরুজ গাজী হত্যা মামলায় জামিনে বের হন ব্যবসায়ী শাহিন সরদারের পরিবার। জামিনে বের হওয়ার পর পরিবারের সদস্যরা প্রাণনাশের শংকায় ভুগছেন। অতিসম্প্রতি উলফাত রানা রুবেল চক্রের অপকর্মের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী শাহিনের পরিবার আদালতে মামলা দায়ের করলে বিভিন্ন মাধ্যমে হুমকি-ধামকি দিচ্ছে। ইতোমধ্যে শাহিন সরদারের পুরো পরিবারের প্রাণ কেড়ে নিতে রুবেলের ওই বিতর্কিত ক্লাবে বসে কিলিং মিশনের পরিকল্পনা করার অভিযোগ উঠেছে।
এসব প্রসঙ্গে যুবদল নেতা উলফাত রানা রুবেলের ব্যক্তিগত সেলফোনে একাধিক বার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেন নি। অবশ্য তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়েরের পর তিনি দলীয়ভাবে প্রতিবাদ করে বলেছেন, তার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার চালানো হচ্ছে।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply