বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:১৬ অপরাহ্ন
ইউনিভার্সেল নিউজ : বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক জোটের উদ্যােগে ফ্যাসিবাদমুক্ত উৎসবমুখর পরিবেশে ব্যতিক্রমধর্মী নানা আয়োজনে এবার বরিশালে যথাযোগ্য মর্যাদায় ঐক্যবদ্ধ জাতি গড়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে মহান বিজয় দিবস পালিত হয়েছে। ছাত্র-জনতার রক্ত আর হাজারো প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশে দীর্ঘ প্রায় ১৬ বছরের স্বৈরাচার শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সরকারিভাবে নানা আয়োজনের পাশাপাশি সকল রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন শোভাযাত্রা ও সভা-সেমিনারের মধ্য দিয়ে নবযাত্রায় জাতি নতুন উদ্যম ও উদ্দীপনা নিয়ে বিজয় দিবস পালন করল। বরিশাল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তিন দিন ব্যাপী অনুষ্ঠানমালার শেষ দিন ১৬ই ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবসের আলোচনা পরবর্তী মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে মাইম থিয়েটার এর মূকাভিনয় -‘স্বপ্ন যেন সোনার হরিণ’ দর্শক নন্দিত হয়। মাইম থিয়েটারের শিল্পীদের অসাধারণ মূকাভিনয়ে উপস্থিত দর্শকদের হর্ষধ্বনি ও করতালিতে মুখর হয়ে উঠেছে চারপাশ। মূকাভিনয়ের সার্বিক পরিচালনার দায়িত্ব পালন করেন বরিশাল মাইম থিয়েটারের পরিচালক এবং ইউনিভার্সেল নিউজ এর সম্পাদক আহমেদ জালাল। রচনা ও নির্দেশনায় ছিলেন- মো.সাব্বির হোসাইন, অভিনয়ে- সুমন্ত চন্দ্র ঘোষ, রানা, মাহিমা, অনিক, রায়হানুল, সাউন্ড ও ভয়েস- সাব্বির হোসাইন, ইতি, ফিহা, সার্বিক সহযোগীতায়- রবিউল, সিফাত সোহেল।
মূকাভিনয় শিল্পকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পরিচিতি করার লক্ষ্যে বরিশাল মাইম থিয়েটার কাজ করে চলছে। মূকাভিনয় শিল্পকলার একটি অঙ্গ। অভিনয়ের বিশেষ বিশেষ মুহূর্ত ও ভাব প্রকাশের জন্য মূকাভিনয় একান্ত অপরিহার্য। বিশেষ বিশেষ ভাব বা রসের শৈল্পিক রূপায়ণে মূকাভিনয়ই একমাত্র বা অমর হয়ে ওঠে। যে কথ্য ভাষার প্রয়োগে নাটক ও অভিনয় জীবন্ত হয়ে ওঠে, কোন কোন মুহূর্তে সেই ভাষার ভাব প্রকাশের অপ্রতুলতা ধরা পড়ে। তখন দেখা যায় সামান্য কোন নীরব ভঙ্গিমার মাধ্যমেই হয়ত ভাষার চেয়েও বেশি ভাব প্রকাশ সম্ভব হয়। অভিনয় শিল্পের অন্যতম অঙ্গ হলো নিখুঁত অভিব্যক্তি কারণ সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনাকে বিশেষ বিশেষ অভিব্যক্তির মাধ্যমে যতখানি প্রকাশ করা সম্ভব, ততখানি প্রকাশ আর কোন কিছুর মাধ্যমেই সম্ভব নয়।
বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক জোট আয়োজিত মহান বিজয় দিবসে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান পরিবেশন করেছে- বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থা (জাসাস) এর বরিশাল জেলা ও মহানগর এবং বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক জোটভুক্ত সদস্য সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন সমূহের শিল্পী বৃন্দ। বিজয় দিবসে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহনকারী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠন সমূহ হলো- জাসাস- বরিশাল জেলা (দ:), জাসাস- বরিশাল মহানগর, কমলকুড়ি, জিয়া শিশু-কিশোর মেলা, সুরের ছোঁয়া সঙ্গীত একাডেমী, সুর সাধনা, নৃত্যাঙ্গন, মাইম থিয়েটার, মিরর ব্যান্ড, রঙ পেন্সিল, কীর্তনখোলা সুরের ধারা, চারুশৈলী, মুক্তচিন্তা সঙ্ঘ, শাপলা-শালুক, কচি কাঁচার মেলা, স্বদেশ সংস্কৃতি, চন্দ্রমেলা, বর্ণালী সুরের মেলা, বাকলা সাহিত্য সংসদ, শফিক ডান্স ট্রুপ, নান্দনিক থিয়েটার।
উল্লেখ্য, ৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশী সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ ও সমুন্নত রাখতে এবং ফ্যাসিবাদ বিরোধী দেশজ সাংস্কৃতিক চর্চা অব্যাহত রাখতে, বাংলাদেশী সংস্কৃতির ধারক-বাহক সমমনা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন সমূহকে নিয়ে “বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক জোট” গঠনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গৃহিত হয়। কেবল মাত্র “বাংলাদেশী সংস্কৃতি”র ধারক-বাহক সমমনা “সামাজিক ও সাংস্কৃতিক স!গঠন” সমূহ এই জোটের সদস্যপদ লাভের জন্য বিবেচিত হবে। সর্বসম্মতভাবে জাসাস এর বরিশাল জেলার আহবায়ক সাংস্কৃতিক সংগঠক এস এম সাব্বির নেওয়াজ সাগরকে বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক জোটের সমন্বয়ক নির্বাচিত করা হয়।
(১) বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থা- জাসাস,
বরিশাল জেলা দক্ষিণ
(২)বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংস্থা- জাসাস,
বরিশাল মহানগর
(৩) বরিশাল সংস্কৃতি কেন্দ্র
৪) শেকড় সাহিত্য সংসদ
৫) জিয়া শিশু-কিশোর মেলা
৬) কমলকুড়ি
৭) রঙ পেন্সিল
৮) মিরর ব্যান্ড
৯) সুর সাধনা
১০) সুরের ছোয়া,
১১) জাতীয় কবিতা পরিষদ
১২) বর্ণ একাডেমি
১৩) শুক্রবারের আড্ডা
১৪) বরিশাল সাংস্কৃতিক সংসদ
১৫) বরিশাল মাইম থিয়েটার
১৬) বাকলা নাট্য মঞ্চ
১৭) সুফিয়ানা কাওয়ালী ব্যান্ড
১৮) বর্ণমালা কালচারাল একাডেমী
১৯) চারুশৈলী
২০) কন্ঠশীলন একাডেমী
২১) স্রোত আবৃতি সঙসদ
২২) সূচনা সাংস্কৃতিক সংসদ
২৩) স্বদেশ সংস্কৃতি
২৪) মুক্তবুলি পাঠক ফোরাম
২৫) হেরার রশ্মি শিল্পী গোষ্ঠী
২৬) কীর্তনখোলা সুরস্রোত
২৭) চন্দ্র মেলা কালচারাল গ্রুপ
২৮) শাপলা-শালুক কচি কাঁচার মেলা
২৯) মুক্তচিন্তা সঙ্ঘ
৩০) বর্ণালী সুরের মেলা
অবশ্য এর আগে গত অক্টোবরে বাংলাদেশী সাংস্কৃতির বিকাশ ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে বরিশালে আত্মপ্রকাশ করে “বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক জোট”। বরিশাল শিল্পকলা একাডেমীর উম্মুক্তমঞ্চে “বাংলাদেশী সাংস্কৃতির ধারক-বাহক স্থানীয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠনের সংগঠকদের নিয়ে প্রস্তাবিত “বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক জোট” গঠন বিষয়ে উম্মুক্ত আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন সাংস্কৃতিক সংগঠক এস এম সাব্বির নেওয়াজ সাগর। সুসংগঠিতভাবে বাংলাদেশী সস্কৃতির বিকাশ ও সমৃদ্ধির লক্ষ্যে সভায় সর্বসম্মতভাবে বাংলাদেশী সাংস্কৃতিক জোট নামে একটি সার্বজনীন দেশজ সাংস্কৃতিক জোট গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।
এদিকে, দীর্ঘ ৯ মাসের লড়াই-সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পাক হানাদারকে পরাজিত করে ৭১ এর ১৬ ডিসেম্বর সবুজের বুকে বিজয়ের লাল টকটকে সূর্যটাকে ছিনিয়ে আনে জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান মুক্তিযোদ্ধারা। বিশ্ব মানচিত্রে খচিত হয় বাংলাদেশ নামের স্বাধীন ভূখণ্ড। একাত্তরে দেশ স্বাধীন হলেও স্বাধীনতার সুফল পায়নি জনগণ। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে গেলেও মানুষ প্রকৃত স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি। স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি মেলেনি। স্বাধীন দেশের মানুষ বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। পাকিস্তানের পরাধীনতার শিকল ভেঙে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার মূলমন্ত্রই ছিল বৈষম্য, দারিদ্র্য, অভাব, দুর্নীতি আর লুটপাট থেকে মুক্তি। এজন্য জুলাই-আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর, সমাজের অবহেলিত মানুষ, ছাত্র-জনতা নেমে এসেছিল স্বৈরাচারকে হটানো জন্য। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে দেশ ছেড়ে পালিয়ে ভারতে যান। ফ্যাসিবাদী শাসনের পতনের মধ্য দিয়ে দেশবাসী নতুন করে মহান বিজয় দিবস উদযাপন করল। ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের অবসান পতন ঘটাতে গিয়ে জনবিস্ফোরণে দেড় হাজারের বেশি মানুষ শহীদ হয়েছেন। আহত হয়েছেন অর্ধ লক্ষ মানুষ। শত শত মানুষ চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। অনেকে তাদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ খুইয়েছেন। হাজার মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। বিপুলসংখ্যক মানুষকে জোরপূর্বক গুমের শিকার হতে হয়েছে।
বাংলাদেশী সাংস্কৃতি জোটের সমন্বয়ক জাসাস’র বরিশাল জেলা আহবায়ক, সাংস্কৃতিক সংগঠক এস এম সাব্বির নেওয়াজ সাগর ইউনিভার্সেল নিউজকে বলেন, বাকস্বাধীনতা হরণকারী ফ্যাসিস্টমুক্ত পরিবেশে এবার বরিশালে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবস ও মহান বিজয় দিবস পালিত হয়েছে।
স্বৈরাচার শেখ হাসিনার পতনের পর শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি প্রিয় মানুষের প্রাণে যে উচ্ছাস, যে বাঁধ ভাঙ্গা জোয়ার এসেছে, তা অব্যাহত থাকুক। ফিরে আসুক আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের অপহৃত ঐতিহ্য।
সাংস্কৃতিক সংগঠক সাব্বির নেওয়াজ সাগর বলেন, ছাত্র-জনতার বিপ্লবে কেবল প্রাথমিক বিজয় অর্জিত হয়েছে মাত্র। পতিত স্বৈরাচারের সময়ে যারা নিজেদের স্বার্থ হাসিল করেছে তারা বিভিন্নভাবে ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। স্বৈরাচার পালিয়েছে, কিন্তু দেশের শাসন ব্যবস্থা ও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে নিয়োজিত প্রেতাত্মাদের এখনো স্বমূলে নির্মূল করা যায় নাই।
পতিত স্বৈরাচার ও তার দোসররা পরিকল্পিতভাবে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে যেসব ছাত্র-জনতা অংশ নিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধের নীল নকশা নিয়ে মাঠে নেমেছে। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার লক্ষ্যে সমাজকে বিভক্ত করাই এই মুহূর্তে তাদের ষড়যন্ত্র। স্বৈরাচারের দোসরদের বিষয়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। তাদের বিরুদ্ধে আমাদের সোচ্চার হতে হবে।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply