বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৩:৪৯ অপরাহ্ন
আহমেদ জালাল : একাত্তরের ডিসেম্বরে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে বিশ্বের বুকে বাংলাদেশ রচিত করে নতুন ইতিহাস। বিশ্বে বাংলাদেশ নামক নতুন এক মানচিত্র। আর এই জয় ছিনিয়ে আনতে জীবন বাজি রেখেছিলে বেশ কয়েকজন নারী। তারামন বেগম তাঁদের মধ্যে অন্যতম। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি তারামন বিবি নামে পরিচিত ছিলেন। এই ১৪ বছরের ছিপছিপে তরুণী দিনের পর দিন নোংরা ডোবার মধ্যে দিয়ে রেকি করছেন। পৃথিবীর সেরা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত শত্রু সৈন্যের বুকের দিকে তাক করে স্টেনগান চালাচ্ছেন। রক্ত ঝড়ছে। দেশ স্বাধীন অবধি চলেছিল যাঁর সংগ্রাম। দেশ তাঁকে কতটুকু মূল্যায়ন করতে পেরেছে? সেই কিশোরীর অসীম সাহসিকতার জন্য বীর প্রতীক খেতাব দেওয়া হলেও আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর হাতে তা তুলে দিতে লেগে যায় দীর্ঘসময়। নিভৃতে জীবন যাপন করা এই সাহসী নারী বীর মুক্তিযোদ্ধাকে খুঁজে পেতেই কেটে গিয়েছিল এতটা সময়?
একাত্তরে এক বাচ্চা মেয়ে তারামন কমান্ডারের নির্দেশে-একটা কলাগাছ বুকে নিয়ে নদী পার হয়ে পাকিস্তানি ক্যাম্পে গেলেন গুপ্তচর হিসেবে। সারা রাত নদী সাঁতরে ওই একা কিশোরী খরস্রোতা নদী পার হলেন। শত্রু শিবির কাছেই। নোংরা কাপড় আর চুলের মধ্যে কাদা মেখে ‘পাগলীর’ বেশ ধরলেন। সারা শরীরে পায়খানা মেখে ঘুরতে থাকলেন ক্যাম্পের আশপাশে। চারদিকে বমি আসার মতো নোংরা দুর্গন্ধ আর চিৎকার চেচামেচি করে মিলিটারি ক্যাম্পের সবাইকে বুঝালেন-তিনি আসলেই পাগলীনি।দিন দিন এভাবেই-তারামন বিবি পাকিস্তানি ক্যাম্পের সমস্ত খবরাখবর নিয়ে আসতেন। কতগুলো অস্ত্র আছে। কয়টা মেয়ে ক্যাম্পে প্রতিদিন ধর্ষিত হচ্ছে। পাকিস্তানি আর রাজাকাররা কোথায় ক’টায় অপারেশন চালাবে। সমস্ত ফিরিস্তি তিনি পাচার করে দিতেন মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে। অথচ এই সংগ্রামী তারামন বিবির কিশোর বেলার স্বপ্ন ছিল। রোজগেরে গিন্নি হওয়ার। গোলাভরা ধান ছিল। ঐশ্বর্য্য ছিল। পাকিস্তানি মিলিটারি এসে তছনছ করে দিয়েছিল সব। সেই ঘরছাড়া কিশোরী মেয়ে মায়ের সাথে ভিক্ষে করতেন। কচুর মাথা সেদ্ধ করে পেট চালাতেন। অন্য গাঁয়ে শরনার্থী হওয়ার পর কাজ পেলেন। মুক্তিযোদ্ধাদের ভাত রেঁধে দেয়ার চুক্তি হিসেবে। মুক্তিযোদ্ধাদের কমান্ডার আজিজ মাস্টার তাকে রাজি করিয়েছিলেন নিজের ‘ধর্ম মেয়ে’ বানিয়ে। বলেছিলেন-পাকিদের ক্যাম্পে প্রতিদিন ধর্ষিতা বোনদের জন্য হলেও উনি যেন বীর মুক্তিযোদ্ধা ভাইদের এটুকু সাহায্য করেন। এমনিতেও রাজাকারের ধরে নিয়ে যাবে,এজন্য খুঁজছে। নিজের ধর্ম বাপের কথায় রাজি হয়ে তারামন বিবি ভাত রাঁধবার চাকরি নিয়েছিলেন,পেটের তাগিদে। নিরাপত্তার খাতিরে। কিন্তু হাড়ি মুছতে গিয়ে একদিন ভারী অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন-আদর্শের জন্যই। চোখ বন্ধ করলে সে আদর্শ টের পাওয়া যায় না। কিন্তু দৃশ্যটা কল্পনা করতে চেষ্টা করতে পারা যায়। যুদ্ধের গোলাগুলির মধ্যে গেরিলাদের ভাত রেঁধে দিচ্ছে এক ১৪ বছরের কিশোরী। ভাইদের প্রয়োজনে-পাকিস্তানি ক্যাম্পে শরীরে পায়খানা মেখে পাগলিনীবেশে গুপ্তচরের দিন কাটাচ্ছেন সেই তারামন বিবি। গাছের ডগায় উঠে পাকিদের অস্ত্র গুণতে থাকা এক চঞ্চল জেদী পাগলিনী। তারপর একদিন নিজেই মুক্তিযুদ্ধের রণাঙ্গনে অস্ত্র চালনা করা বীর প্রতীক বিবি।
তারামন বিবির জন্ম ১৯৫৭ সালে কুড়িগ্রামের চর রাজিবপুর উপজেলার শংকর মাধবপুর গ্রামে। মোছাম্মৎ তারামন বেগম যিনি তারামন বিবি নামে অধিক পরিচিত, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন নারী বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও।
১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় ১১নং সেক্টরের হয়ে তারামন বিবি জীবনবাজি রেখে মুক্তিযুদ্ধ করেন। সম্মুখ যুদ্ধে পাকবাহিনীদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করায় তাঁর অনেক অবদান রয়েছে। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন সরকার মুক্তিযুদ্ধে সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তারামন বিবিকে ‘বীর প্রতীক’ উপাধিতে ভূষিত করে। কিন্তু ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত তাঁর খোঁজ মেলেনি। সে সময় ময়মনসিংহের আনন্দ মোহন কলেজের সাবেক শিক্ষক বিমল কান্তি দে মুক্তিযুদ্ধের ওপর কাজ করতে গিয়ে তারামন বিবি নামের একজন খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধার নাম পান। কিন্তু ১১ নম্বর সেক্টরের এই নারী যোদ্ধার ঠিকানা তিনি পাননি। অনেক চেষ্টার পর রাজীবপুরের বাসিন্দা মুক্তিযোদ্ধা আবদুর সবুর ফারুকী ও সোলায়মান আলীর মাধ্যমে খোঁজ পান তারামন বিবির। তাঁকে খুঁজে পাওয়ার খবরটা ১৯৯৫ সালের ২১ নভেম্বর দৈনিক ভোরের কাগজ এ প্রকাশ হয়। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে তারামন বিবির বীরত্বগাথা। ১৯৯৫ সালের ১৯ ডিসেম্বর সরকারের পক্ষ থেকে তারামন বিবির হাতে সম্মাননা তুলে দেওয়া হয়। এ সময় তারামন বিবির সাহায্যার্থে বিশেষ তহবিল গঠন করে ভোরের কাগজ। পত্রিকাটির কর্মীদের বেতন দিয়ে তহবিল শুরু হয়। এরপর অনেকেই অনুদান প্রদান করেন এ তহবিলে। তহবিলের অর্থ দিয়ে তারামন বিবিকে জমি কিনে দেওয়াসহ নানারকম সহায়তা করা হয়। স্বাধীন মাটিতেই ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর না ফেরার দেশে চলে যান বীর মুক্তিযোদ্ধা তারামন বিবি।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply