বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:১৮ অপরাহ্ন
ইউনিভার্সেল নিউজ : বরিশালের কাশিপুর বাজারে ‘মব’ তৈরি করে মা ও মেয়েকে খুনের চেষ্টায় হেনস্তা ও নির্যাতনের নেপথ্যে সম্পত্তির প্রতি ইমাম ও মসজিদ কমিটির লোভ। হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করে এই মেয়ে মসজিদ ভেঙ্গেছে প্রকাশ্যে এমন তকমা দিয়ে দ্বিতীয় ইমাম নুরে আলম এবং কমিটির সহ-সভাপতি সিরাজুল ইসলাম সেখানে একদল উচ্ছৃঙ্খল জনতা জড়ো করে নির্যাতন চালাতে উস্কানী দেন। বিশেষ করে জামায়াতের সেক্রেটারী পরিচয় দিয়ে এক ব্যক্তি ‘মব ভায়োলেন্স’ সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখেন।
বরিশাল সদর উপজেলার কাশিপুর ইউনিয়নের প্রয়াত অলিউদ্দিন আহাম্মদের জ্যেষ্ঠ কন্যা আফসানা আহমেদ ঢাকা বিশ্বিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স শেষ করে বর্তমানে বরিশাল ল’ কলেজের শিক্ষার্থী। কনিষ্ঠ পুত্র আশিক অস্ট্রেলিয়ায় উচ্চতর শিক্ষার জন্য অবস্থান করছেন। ২০১২ সালে তার পিতা মারা যাওয়ার পর আফসানাদের কাশিপুর বাজারের কাছে ঢাকা-বরিশাল মহাড়ক সংলগ্ন একটি সম্পত্তির দিকে লোলুপ দৃষ্টি পড়ে ওয়াজেদিয়া জামে মসজিদের প্রথম ইমাম জাকারিয়া সহ স্থানীয় ভূমিদস্যুদের। মহাসড়ক সংলগ্ন সম্পত্তি দখলে ভুক্তভোগী পরিবারকে নানাভাবে হেনস্থা, অব্যাহত হামলা সহ জালজালিয়াতির ঘটনাও ঘটে। একপর্যায়ে সেই সম্পত্তি দখলে ব্যর্থ হলে লোভী ইমাম আরো বেপরোয়া হয়ে উঠে। নির্যাতন ও হয়রানির শিকার পরিবারের মসজিদের পাশের একটি স্টল ও স্ব মিল দীর্ঘদিন ধরে দখলের পাঁয়তারা চালিয়ে আসছেন ইমাম ও মসজিদ কমিটি। এরইধারাবাহিকতায় স্টল দখল করতে গত ২৬ মে মসজিদের সামনে ইট, বালু ও সিমেন্ট জড়ো করেন মসজিদ কমিটি। এ বিষয়ে সিটি কর্পোরেশনে একটি লিখিত অভিযোগও দেওয়া হয়। গত ২৭ মে গাথুনী করে স্টলটি মসজিদের সঙ্গে জুড়ে দিতে কাজ শুরু করে। খবর পেয়ে রাত আনুমানিক সাড়ে ৮ টার দিকে দিকে আফসানা ও তার বৃদ্ধা মা সেখানে উপস্থিত হয়ে তাদের স্টল দখলের প্রতিবাদ করেন। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠে প্রথম ইমামের অনুগত দ্বিতীয় ইমামসহ দখল সন্ত্রাসীরা। এরপর মা ও মেয়েকে তাদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান অলি এন্টারপ্রাইজের পাশে ঘেরাও করে বলতে থাকেন, এই নষ্ট মেয়ে মসজিদ ভেঙ্গেছে। দফায় দফায় মা ও মেয়েকে হেনস্থা ও মারধর করা হয়। নির্যাতন চলাকালীন পেশাগত দায়িত্ব পালনে ঘটনাস্থলে গেলে মব সৃষ্টিকারী উগ্ররা এ প্রতিবেদকের ওপর বর্বর হামলা চালায়। এর ঘন্টাখানেক পর বরিশাল বিমান বন্দর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছেন। সেখানে কোন নারী পুলিশ সদস্য ছিল না। পুলিশের সামনেই দ্বিতীয় ইমাম নুরে আলম মসজিদের দোতালা থেকে প্রতিবাদকারী মা ও মেয়েকে লক্ষ্য করে ডিম ছুঁড়ে মারেন। এবং সংঘবদ্ধ উচ্ছৃঙ্খলকারীরা শ্লোগান দিয়ে বলতে থাকেন এরা স্বৈরাচারের দোসর। এই মেয়ের বাবা আওয়ামী লীগ করতেন, স্বামী আওয়ামী লীগ করতেন। যেখানে আফসানা অবিবাহিত। পুলিশ এদেরকে থানায় নিয়ে ছেড়ে দিলে থানা ঘেরাও করা হবে বলে হুমকি দেয়। কোন নারী পুলিশ ছাড়াই তিন জন পুরুষ পুলিশ সদস্য পিকআপে মা ও মেয়েকে তুলে নিয়ে থানায় যান। পুলিশের সঙ্গে পিকআপে মব সৃষ্টিকারী কয়েকজনও যেতে চেয়েছিল। থানায় নেওয়ার প্রায় এক ঘন্টা পর তাদেরকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। থানা থেকে বের হয়ে মা ও মেয়ে সেনাবাহিনীর ক্যাম্পে গিয়ে সহায়তা চাইলে সেখান থেকে বলা হয়- থানায় যোগাযােগ করতে। আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তা না পেয়ে পরিবারটি নিরুপায় হয়ে পড়ে।
নির্যাতনের শিকার আইনের শিক্ষার্থী আফসানা বলেন, আমার প্রয়াত বাবা কাশিপুর বাজারে নিজ অর্থে ওয়াজেদিয়া জামে মসজিদ নামক একটি মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছেন। মসজিদটির ইমাম জাকারিয়া এবং সভাপতি আব্দুস সালাম আমার বাবার সময়কার। মসজিদটির প্রথম এবং আমৃত্যু মোতাওয়াল্লি ছিলেন আমার বাবা। মসজিদের ইমাম জাকারিয়া ঢাকা-বরিশাল মহাসড়ক সংলগ্ন এলাকায় একখানা জমি আমার চাচা রফিকুল ইসলাম শাহিনের কাছ থেকে ক্রয় করেন। যার মূল্য কয়েক কোটি টাকা। এর সামনেই আমাদের জমি। পরবর্তীতে ইমামের নজর পরে আমাদের সম্পত্তির প্রতি। সে জমি বিক্রি করতে রাজি না হওয়ায় উক্ত মসজিদ কমিটির সভাপতি সালাম মিয়াসহ তৎকালীন স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ফরিদের যোগশাজসে চাচা, ফুফুদের দ্বারা একটি জাল রোয়েদাদ সৃষ্টি করেন। এমনকি আমার ছোট ভাই, মা ও আমার স্বাক্ষর জালিয়াতি করে জাল রোয়েদাদ সৃষ্টির অপচেষ্টা করেন। এ ঘটনায় মামলা দায়ের করে পক্ষে রায় পেলে মাকে খুন ও প্রাণনাশের হুমকি দেয়া হয়।
তিনি বলেন, ২০২৩ সালে মসজিদের দ্বিতীয় ইমাম নূরে আলম আমাদের পরিবারের বিরুদ্ধে পুলিশ কমিশনারের কাছে অভিযোগ দিলে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়। দ্বিতীয় ইমাম গত ২৬ জানুয়ারি আমার ওপর হামলা চালায়। এ ঘটনায় মামলা নং-সিআর মো: ৪১/২৫ (বিমানবন্দর) আদালতে চলমান রয়েছে।
আফসানা বলেন, মসজিদের কাছে আমাদের একটি স্টল রয়েছে। ওই স্টলটি দখলের জন্য মসজিদ কমিটি বিভিন্ন সময় চেষ্টা করে আসছে। গত ২৭ মে রাতে ইট, বালু, সিমেন্ট এনে অবৈধভাবে ইমারত নির্মাণ করে তাদের স্টলটিকে মসজিদের সাথে একত্রিত করার জন্য গাঁথুনি দেওয়া শুরু করেন। এর প্রতিবাদ করায় একজন ব্যক্তি যিনি নিজেকে জামায়াতের সেক্রেটারি দাবি করে তার ওপর চড়াও হন এবং দ্বিতীয় ইমাম নূরে আলম ওয়াজেদিয়া জামে মসজিদের সহ-সভাপতি সিরাজুল ইসলামসহ ৫/৭ জনের নেতৃত্বে মব সৃষ্টির উদ্দেশ্যে মাস্তান প্রকৃতির লোক জড়ো করান। তারা সকলে মিলে আমাকে ও মাকে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে ডিম ছুঁড়ে মারেন। এমনকি আওয়ামী লীগের দোসর আখ্যা দিয়ে অবরুদ্ধ করে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হলেও পুলিশ বিষয়টি তদন্ত করে মিথ্যা প্রমাণিত হওয়ায় থানা থেকে ছেড়ে দেয়। ঘটনার পর থেকে এখন পর্যন্ত আমরা চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছি। এমনকি নিজ বাসায় পর্যন্ত যেতে পারছি না। আমাদের ওপর মব সৃষ্টি করে যে নির্যাতন, খুনের চেষ্টা করা হয় তার বিরুদ্ধে সরকার ও প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে ন্যায় বিচার দাবি করছি।
ইমাম নূরে আলম বলেন, গত ২৭ মে রাতে এশার নামাজ চলাকালীন সময় দুই নারী এসে মসজিদ ভাঙচুরের চেষ্টা করেন। এসময় মুসল্লিরা তাদের ওপর চড়াও হয়েছে। পরবর্তীতে পুলিশ এসে তাদের নিয়ে গেছে।
মসজিদের প্রথম ইমাম জাকারিয়া ইসলাম হজ্ব করতে বর্তমানে সৌদি আরব অবস্থান করছেন। এজন্য তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
মা ও মেয়েকে ঘিরে মব তৈরি প্রসঙ্গে বরিশাল বিমান বন্দর থানার ওসি জাকির সিকদার বলেন, আসলে এটাকে মব বলা ঠিক হবে না। এটা মব নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, আসলে সেখানে জমি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করে মসজিদ কমিটি ও ওই মেয়ের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হচ্ছিল। সেখানকার একটি স্টল উভয় পক্ষই নিজেদের সম্পত্তি বলে দাবি করে আসছে। মসজিদ কমিটির কাজে বাধা প্রদান করায় মুসল্লীরা ক্ষিপ্ত হয়। একপর্যায়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করে মেয়েটিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply