বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০২:১৮ অপরাহ্ন

Welcome! Thank you for visiting our newspaper website.
প্রধান সংবাদ :
গৌরনদীতে সম্পত্তি দখলের পাঁয়তারায় চলাচলের রাস্তা কেটে ফেলে নরসুন্দরকে নির্যাতন মানুষ মদিনার ইসলামে বিশ্বাসী, ‘মওদুদীর ইসলামে’ নয় : সালাহউদ্দিন আহমেদ কবে দেশে ফিরছেন তারেক রহমান, জানালেন পিএস নূরউদ্দিন অপু বাকেরগঞ্জে বিএনপি নেতাদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার মামলায় ছাত্রলীগ নেতা গ্রেপ্তার বানারীপাড়ায় অগ্নিকান্ডে দুটি বসত ঘর পুড়ে ছাই বরিশালে এখন সাংবাদিকতা মানে চা আর কমিশন! ট্রাম্পের ভাষণের সময় ইসরায়েলের পার্লামেন্টে ‘ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি’র দাবি তুলেছেন এমপি আইমান ও কাসিফ দ্রুত দেশে ফিরে নির্বাচনে অংশ নিবেন তারেক রহমান বরিশাল মৎস্যজীবী দলের সভাপতি রুস্তম আলী মল্লিকের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে আওয়ামী লীগের দোসরদের পুনর্বাসনের অভিযোগ বরিশালে সুরুজ গাজী হত্যার নেপথ্যে যুবদল নেতা উলফাত রানা রুবেলের চাঁদাবাজির ভাগ-বাটোয়ারা!
সাম্যবাদের জোরালো প্রবক্তা বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল

সাম্যবাদের জোরালো প্রবক্তা বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল

universalnews24.com is an Bengali language news website of Bangladesh. It's edited and published by Jalal Ahmed Mridha (Journalist Ahmed Jalal).
সাম্যবাদের জোরালো প্রবক্তা কাজী নজরুল

আহমেদ জালাল : আমার গায়ে জাতপাত, ধর্ম-বর্ণ লেখা নেই। আমার গায়ে নাম লেখা নেই।‌ আমার পরিচয় হোক “আমি মানুষ “। আমাদের পরিচয় হোক ” আমরা মানুষ “। মানুষের পরিচয় হোক ” আমরা মানুষ “। অর্থাৎ ধর্ম,বর্ণ, জাত-পাত নয় ‘মানুষ’ পরিচয়ই শ্রেষ্ঠ। মনুষ্যসৃষ্ট নানা বিভেদরেখায় বিভক্ত সমাজের বিবর্ণ চিত্র দেখে বিচলিত ছিলেন বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। আর এ কারণেই তাঁর রচিত সাহিত্যের প্রধান উপাদান মানবতাবাদ, সাম্যবাদ এবং অসাম্প্রদায়িক চেতনা। সকল ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে ভেদাভেদহীন-জাতপাতহীন এক উন্নত সমাজ প্রত্যাশা করেছেন নজরুল। সাম্যবাদ ও মানবতার কবি নজরুল ইসলাম। তিনি মানুষ হিসেবে মানুষের মর্যাদাকে সবার উপরে দেখেছেন। আজীবন মানুষের ধর্মকে নজরুল বড় করে দেখেছেন। মানুষের ধর্ম বলতে তিনি মানবতাকে বুঝিয়েছেন। মানুষের ধর্ম বলতে মানবধর্মকে বড় করে দেখেছেন নজরুল। তাঁর কবিতার মূল বিষয়বস্তু মানুষের প্রতি মানুষের অত্যাচার, শোষণ-দাসত্বের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ। এই পৃথিবীতে কবি-সাহিত্যিক-লেখকদের মধ্যে সাম্যবাদের জোরালো প্রবক্তা ছিলেন কাজী নজরুল।

বিপ্লবী কবি কাজী নজরুল

বাংলা সাহিত্যে কাজী নজরুল ইসলামকে বলা হয় বিদ্রােহী কবি। বিংশ শতাব্দীর প্রধান বাঙালি কবি ও সঙ্গীতকার। সাহিত্যের নানা শাখায় বিচরণ করলেও তাঁর প্রধান পরিচয় তিনি একজন বিপ্লবী কবি।বাঙালির জাগরণের কবি ছিলেন কাজী নজরুল। তাঁর কবিতায় ছিল সাম্প্রদায়িকতা, পরাধীনতা, দেশি বিদেশি শোষকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী ভূমিকা। সাম্যবাদের চেতনায় অবিচল নজরুল। সাম্যবাদী আদর্শে বিশ্বাসী নজরুল তাঁর কবিতা ও গানে তুলে ধরেছেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব, ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা, স্বাধীনতা আন্দোলন এবং নবজাগ্রত মুসলিম মধ্যবিত্তের স্বপ্ন-সম্ভাবনা নজরুলের কবিমানসকে করে তুলেছিল আলোক-উদ্ভাসিত। তিনি মানুষের মানবিকতাকে, চেতনাবোধকে জাগ্রত করেছেন এবং দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

সাম্যবাদী কবি নজরুল

কাজী নজরুল স্বপ্ন দেখেছেন এক সাম্যবাদী সমাজের, যেখানে নেই শোষণ, বৈষম্য আর সাম্প্রদায়িক বিভেদ। সাম্যবাদী কবিতায় তিনি বলেছেন-
‘গাহি সাম্যের গান-
যেখানে আসিয়া এক হয়ে গেছে সব বাধা-ব্যবধান,
যেখানে মিশেছে হিন্দু-বৌদ্ধ-মুসলিম-ক্রিশ্চান’
নজরুল ইসলাম বিশ্বাস করেন, ‘মানুষের হৃদয়ের চেয়ে বড় কোনো মন্দির-কাবা নাই’।
মানুষ কবিতায় লিখেছেন: “পূজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল মূর্খরা সব শোন/ মানুষ এনেছে গ্রন্থ, গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোন ”
আমার পরিচয় হোক “আমি মানুষ ”
কাজী নজরুল ইসলাম ‘মানুষ’ কবিতায় লিখেছেন-
গাহি সাম্যের গান-
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!
নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্ম জাতি,
সব দেশে, সব কালে, ঘরে ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।-
পূজারী, দুয়ার খোলো,
ক্ষুধার ঠাকুর দাঁড়ায়ে দুয়ারে পূজার সময় হলো!’
স্বপন দেখিয়া আকুল পূজারী খুলিল ভজনালয়,
দেবতার বরে আজ রাজা-টাজা হ’য়ে যাবে নিশ্চয়!-
জীর্ণ-বস্ত্র শীর্ণ-গাত্র, ক্ষুধায় কন্ঠ ক্ষীণ
ডাকিল পান্থ, ‘দ্বার খোলো বাবা, খাইনিকো সাত দিন!’
সহসা বন্ধ হলো মন্দির, ভুখারী ফিরিয়া চলে,
তিমির রাত্রি, পথ জুড়ে তার ক্ষুধার মানিক জ্বলে!
ভুখারি ফুকারি কয়,
ঐ মন্দির পূজারীর, হায় দেবতা, তোমার নয়!’
মসজিদে কাল শিরনি আছিল, অঢেল গোস্ত-রুটি
বাঁচিয়া গিয়াছে, মোল্লা সাহেব হেসে তাই কুটিকুটি!
এমন সময় এলো মুসাফির গায়ে আজারির চিন,
বলে ‘বাবা, আমি ভুকা-ফাঁকা আছি আজ নিয়ে সাত দিন!’
তেরিয়া হইয়া হাঁকিল মোল্লা – ‘ভ্যালা হলো দেখি লেঠা,
ভুখা আছো মরো গো-ভাগাড়ে গিয়ে! নামাজ পড়িস বেটা?’
ভুখারী কহিল, ‘না বাবা!’ মোল্লা হাঁকিল – ‘তা হলে শালা,
সোজা পথ দেখ!’ গোস্ত-রুটি নিয়া মসজিদে দিল তালা!
ভুখারি ফিরিয়া চলে,
চলিতে চলিতে বলে-
‘আশিটা বছর কেটে গেল, আমি ডাকিনি তোমায় কভু,
আমার ক্ষুধার অন্ন তা’বলে বন্ধ করনি প্রভু!
তব মসজিদ-মন্দিরে প্রভু নাই মানুষের দাবি,
মোল্লা-পুরুত লাগায়েছে তার সকল দুয়ারে চাবি!’
কোথা চেঙ্গিস, গজনি-মামুদ, কোথায় কালাপাহাড়?
ভেঙে ফেল ঐ ভজনালয়ের যত তালা-দেওয়া-দ্বার!
খোদার ঘরে কে কপাট লাগায়, কে দেয় সেখানে তালা?
সব দ্বার এর খোলা রবে, চালা হাতুড়ি-শাবল চালা!
হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভন্ড গাহে স্বার্থের জয়!
মানুষেরে ঘৃণা করি
ও কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি
ও মুখ হইতে কেতাব-গ্রন্থ নাও জোর করে কেড়ে,
যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে,
পূজিছে গ্রন্থ ভন্ডের দল! -মূর্খরা সব শোনো,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ; -গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।
আদম দাউদ ঈসা মুসা ইব্রাহিম মোহাম্মাদ
কৃষ্ণ বুদ্ধ নানক কবীর,-বিশ্বের সম্পদ,
আমাদেরি এঁরা পিতা-পিতামহ, এই আমাদের মাঝে
তাঁদেরি রক্ত কম-বেশি করে প্রতি ধমনীতে রাজে!
আমরা তাঁদেরি সন্তান, জ্ঞাতি, তাঁদেরি মতন দেহ,
কে জানে কখন মোরাও অমনি হয়ে যেতে পারি কেহ।
হেসো না বন্ধু! আমার আমি সে কত অতল অসীম,
আমিই কি জানি কে জানে কে আছে আমাতে মহামহিম।
হয়ত আমাতে আসিছে কল্কি, তোমাতে মেহেদী ঈসা,
কে জানে কাহার অন্ত ও আদি, কে পায় কাহার দিশা?
কাহারে করিছ ঘৃণা তুমি ভাই, কাহারে মারিছ লাথি?
হয়ত উহারই বুকে ভগবান্‌ জাগিছেন দিবারাতি!
অথবা হয়ত কিছুই নহে সে, মহান উচ্চ নহে,
আছে ক্লেদাক্ত ক্ষত-বিক্ষত পড়িয়া দুঃখ-দহে,
তবু জগতের যত পবিত্র গ্রন্থ ভজনালয়
ঐ একখানি ক্ষুদ্র দেহের সম পবিত্র নয়!
হয়তো ইহারি ঔরসে ভাই ইহারই কুটির-বাসে
জন্মিছে কেহ- জোড়া নাই যার জগতের ইতিহাসে!
যে বাণী আজিও শোনেনি জগৎ, যে মহাশক্তিধরে
আজিও বিশ্ব দেখনি,-হয়ত আসিছে সে এরই ঘরে!
ও কে? চন্ডাল? চম্‌কাও কেন? নহে ও ঘৃণ্য জীব!
ওই হতে পারে হরিশচন্দ্র, ওই শ্মশানের শিব।
আজ চন্ডাল, কাল হ’তে পারে মহাযোগী-সম্রাট,
তুমি কাল তারে অর্ঘ্য দানিবে, করিবে নান্দীপাঠ।
রাখাল বলিয়া কারে করো হেলা, ও-হেলা কাহারে বাজে!
হয়ত গোপনে ব্রজের গোপাল এসেছে রাখাল সাজে!
চাষা বলে কর ঘৃণা!
দেখো চাষা-রূপে লুকায়ে জনক বলরাম এলো কি না!
যত নবী ছিল মেষের রাখাল, তারাও ধরিল হাল,
তারাই আনিল অমর বাণী-যা আছে রবে চিরকাল।
দ্বারে গালি খেয়ে ফিরে যায় নিতি ভিখারী ও ভিখারিনী,
তারি মাঝে কবে এলো ভোলা-নাথ গিরিজায়া, তা কি চিনি!
তোমার ভোগের হ্রাস হয় পাছে ভিক্ষা-মুষ্টি দিলে,
দ্বারী দিয়ে তাই মার দিয়ে তুমি দেবতারে খেদাইলে।
সে মার রহিল জমা-
কে জানে তোমায় লাঞ্ছিতা দেবী করিয়াছে কিনা ক্ষমা!
বন্ধু, তোমার বুক-ভরা লোভ, দু’চোখে স্বার্থ-ঠুলি,
নতুবা দেখিতে, তোমারে সেবিতে দেবতা হ’য়েছে কুলি।
মানুষের বুকে যেটুকু দেবতা, বেদনা-মথিত-সুধা,
তাই লুটে তুমি খাবে পশু? তুমি তা দিয়ে মিটাবে ক্ষুধা?
তোমার ক্ষুধার আহার তোমার মন্দোদরীই জানে
তোমার মৃত্যু-বাণ আছে তব প্রাসাদের কোনোখানে!
তোমারি কামনা-রানি
যুগে যুগে, পশু, ফেলেছে তোমায় মৃত্যু-বিবরে টানি।

মানুষ এনেছে গ্রন্থ;-গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো

হায় রে ভজনালয়,
তোমার মিনারে চড়িয়া ভণ্ড গাহে স্বার্থের জয়!
মানুষেরে ঘৃণা করি’
ও’ কারা কোরান, বেদ, বাইবেল চুম্বিছে মরি মরি
ও’ মুখ হইতে কেতাব-গ্রন্থ নাও জোর করে কেড়ে,
যাহারা আনিল গ্রন্থ-কেতাব সেই মানুষেরে মেরে,
পূজিছে গ্রন্থ ভণ্ডের দল ! -মূর্খরা সব শোনো,
মানুষ এনেছে গ্রন্থ;-গ্রন্থ আনেনি মানুষ কোনো।

আমার কৈফিয়ৎ

আমার কৈফিয়ৎ কবিতাটি লিখেছেন বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। এই কবিতাটি ‘সর্বহারা’ কাব্যগ্রন্থের অন্তর্গত। এই কাব্যগ্রন্থটি ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথম প্রকাশিত হয়। কবি কাজী নজরুল ইসলামের রচিত এই কাব্যগ্রন্থ মোট দশটি কবিতা রয়েছে, তাঁর মধ্যে আমার কৈফিয়ৎ কবিতাটি অন্যতম।
বর্তমানের কবি আমি ভাই, ভবিষ্যতের নই ‘নবী’
কবি ও অকবি যাহা বলো মোরে মুখ বুজে তাই সই সবি!
কেহ বলে, ‘তুমি ভবিষ্যতে যে
ঠাঁই পাবে কবি ভবীর সাথে হে!
যেমন বেরোয় রবির হাতে সে চিরকেলে –বাণী কই, কবি?’
দুষিছে সবাই, আমি তবু গাই শুধু প্রভাতের ভৈরবী!
কবি বন্ধুরা হতাশ হইয়া মোর লেখা প’ড়ে শ্বাস ফেলে।
বলে, কেজো ক্রমে হচ্ছে অকেজো পলিটিক্সের পাঁশ ঠেলে।
পড়েনাক’ বই, ব’য়ে গেছে ওটা।
কেহ বলে, বৌ-এ গিলিয়াছে গোটা।
কেহ বলে, মাটি হ’ল হ’য়ে মোটা জেলে ব’সে শুধু তাস খেলে।
কেহ বলে, তুই জেলে ছিলি ভালো, ফের যেন তুই যা’স জেলে।
গুরু ক’ন, তুই করেছিস শুরু তলোয়ার দিয়ে দাড়ি চাঁচা।
প্রতি শনিবারই চিঠিতে প্রেয়সী গালি দেন, ‘তুমি হাঁড়িচাঁচা!’
আমি বলি, ‘প্রিয়ে, হাটে ভাঙি হাঁড়ি-‌’
অমনি বন্ধ চিঠি তাড়াতাড়ি।
সব ছেড়ে দিয়ে করিলাম বিয়ে, হিন্দুরা ক’ন, আড়ি চাচা!
যবন না আমি কাফের ভাবিয়া খুঁজি টিকি দাড়ি, নাড়ি কাছা!
মৌ-লোভী যত মৌলভী আর ‘মোল-লারা’ ক’ন হাত নেড়ে,
‘দেব-দেবী নাম মুখে আনে, সবে দাও পাজিটার জাত মেরে!’
ফতোয়া দিলাম কাফের কাজী ও,
যদিও শহীদ হইতে রাজী ও!
‘আম পারা’-পড়া হাম-বড়া মোরা এখনো বেড়াই ভাত মেরে!’
হিন্দুরা ভাবে, ‘পার্শী-শব্দে কবিতা লেখে, ও পা’ত-নেড়ে!
আনকোরা যত ননভায়োলেন্ট নন্-কো’র দলও নন্ খুশী।
‘ভায়োলেন্সের ভায়োলিন’ নাকি আমি, বিপ্লবী -মন তুষি।
‘এটা অহিংস’, বিপ্লবী ভাবে,
‘নয় চরকরা গান কেন গা’বে?’
গোঁড়া-রাম ভাবে নাস্তিক আমি, পাতি-রাম ভাবে কনফুসি!
স্বরাজীরা ভাবে নারাজী, নারাজীরা ভাবে তাহাদের অঙ্কুশি!
নর ভাবে, আমি বড় নারী -ঘেঁষা! নারী ভাবে, নারী বিদ্বেষী।
‘বিলেত ফেরনী?’ প্রবাসী বন্ধু ক’ন, এই তব বিদ্যে ছি!
ভক্তরা বলে, ‘নবযুগ-রবি !’-
যুগের না হই, হুজুগের কবি
বটি তো রে দাদা , আমি মনে ভাবি, আর ক’ষে কষি হৃদ- পেশী,
দু’কানে চশমা আঁটিয়া ঘুমানু, দিব্যি হ’তেছে নিদ্ বেশী!
কি যে লিখি ছাই মাথা ও মুন্ডু, আমিই কি বুঝি তার কিছু?
হাত উঁচু আর হ’ল না তো ভাই, তাই লিখি ক’রে ঘাড় নীচু!
বন্ধু ! তোমরা দিলেনাক’ দান,
রাজ-সরকার রেখেছেন মান !
যাহা কিছু লিখি অমূল্য ব’লে অ-মূল্যে নেন ! আর কিছু
শুনেছ কি, হুঁ হুঁ, ফিরেছে রাজার প্রহরী সদাই কার পিছু?
বন্ধু ! তুমিতো দেখেছ আমায় আমার মনের মন্দিরে,
হাড় কালি হল, শাসাতে নারিনু তবু পোড়া মন-বন্দীরে!
যতবার বাঁধি ছেঁড়ে সে শিকল,
মেরে মেরে তারে করিল বিকল,
তবু যদি কথা শুনে সে পাগল ! মানিল না রবি-গান্ধীরে!
হঠাৎ জাগিয়া বাঘ খুঁজে ফেরে নিশার আঁধারে বন চিরে !
আমি বলি, ওরে কথা শোন ক্ষ্যাপা, দিব্যি আছিস খোশহালে!
প্রায় ‘হাফ’ নেতা হয়ে উঠেছিস, এবার এ দাঁও ফসকালে
‘ফুল’-নেতা আর হবিনে যে হায় !
বক্তৃতা দিয়া কাঁদিতে সভায়
গুঁড়ায়ে লঙ্কা পকেটেতে বোকা এই বেলা ঢোকা! সেই তালে
নিস্ তোর ফুটো ঘরটাও ছেয়ে, নয় পস্তাবি শেষকালে।
বোঝেনাক’ সে যে চারণের বেশে ফেরে দেশে দেশে গান গেয়ে
গান শুনে সবে ভাবে, ভাবনা কি ! দিন যাবে এবে পান খেয়ে।
রবেনাক’ ম্যালেরিয়া মহামারী,
স্বরাজ আসিছে চ’ড়ে জুড়ি-গাড়ী,
চাঁদা চাই, তারা ক্ষুধার অন্ন এনে দেয়, কাঁদে ছেলে-মেয়ে।
মাতা কয়, ওরে চুপ্ হতভাগা, স্বরাজ আসে যে, দেখ্ চেয়ে!
ক্ষুধাতুর শিশু চায় না স্বরাজ, চায় দুটো ভাত , একটু নুন,
বেলা ব’য়ে যায়, খায়নিক’ বাছা, কচি পেটে তার জ্বলে আগুন।
কেঁদে ছুটে আসি পাগলের প্রায়,
স্বরাজের নেশা কোথা ছুটে যায়!
কেঁদে বলি, ওগো ভগবান তুমি আজিও আছ কি? কালি ও চুন
কেন ওঠেনাক’ তাহাদের গালে, যারা খায় এই শিশুর খুন?
আমরা তো জানি, স্বরাজ আনিতে পোড়া বার্তাকু এনেছি খাস।
কত শত কোটী ক্ষুধিত শিশুর ক্ষুধা নিঙাড়িয়া কাড়িয়া গ্রাস
এল কোটী টাকা, এল না স্বরাজ!
টাকা দিতে নারে ভুখারি সমাজ।
মা’র বুক হতে ছেলে কেড়ে খায়, মোরা বলি, বাঘ, খাও হে ঘাস!
হেরিনু, জননী মাগিছে ভিক্ষা ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ!
বন্ধু গো, আর বলিতে পারি না, বড় বিষ-জ্বালা এই বুকে,
দেখিয়া শুনিয়া ক্ষেপিয়া গিয়াছি, তাই যাহা আসে কই মুখে,
রক্ত ঝরাতে পারি না তো একা,
তাই লিখে যাই এ রক্ত-লেখা,
বড় কথা বড় ভাব আসেনাক’ মাথায়, বন্ধু, বড় দুখে!
অমর কাব্য তোমরা লিখিও, বন্ধু, যাহারা আছ সুখে!
পরোয়া করি না, বাঁচি বা না-বাঁচি যুগের হুজুগ কেটে গেলে,
মাথার ওপরে জ্বলিছেন রবি, রয়েছে সোনার শত ছেলে।
প্রার্থনা ক’রো-যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ কোটী মুখের গ্রাস,
যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ!
মানবতার কবি কাজী নজরুল ইসলাম পশ্চিম বাংলার বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমার জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ মে তারিখে জন্ম গ্রহণ করেন। বাংলা তারিখ ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ। মৃত্যু: ২৯ আগস্ট ১৯৭৬; ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৬ – ১২ ভাদ্র ১৩৮৩ বঙ্গাব্দ)। বলাবাহুল্য : ১৩০৬ বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ ছিল গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৮৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ মে। বাংলা একাডেমি কর্তৃক বাংলা বর্ষপঞ্জি সংশোধনের পর, সংশোধিত বর্ষপঞ্জি অনুসারে বঙ্গাব্দের ১১ জ্যৈষ্ঠ বর্তমানে খ্রিষ্টাব্দের ২৫ মে তারিখে পড়েছে ও এইদিনে বাংলাদেশে নজরুলের জন্মদিন পালন করা হয়।

জাগ অনশন বন্দী ওঠ রে যতআমার পরিচয় হোক ‌”আমি মানুষ “

বিদ্রাহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন গণমুখী সাহিত্যিক; ধর্মান্ধতা, অন্যায়-অবিচারসহ সকল ধরণের বৈষম্যের বিরুদ্ধে সর্বদা প্রতিবাদী। শ্রেনীবৈষম্যের শিকার মানুষগুলোই হয়ে ওঠে তাঁর কবিতার মূখ্য বিষয়। তিনি আজীবন অসাম্প্রদায়িক মানবিক সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন। কিন্তু সাম্প্রদায়িক শক্তি আজও প্রগতির চাকাকে অন্ধকার গলিতে নিতে উঠেপড়ে লেগেছে। এই সাম্প্রদায়িক অপশক্তির বিরুদ্ধে সকলকে জাগ্রত হতে হবে। নজরুলের জীবন ও সাহিত্য থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে সামনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে।
সবমিলিয়ে‌ নজরুল আজীবন মানুষের ধর্মকে বড় করে দেখেছেন। তিনি মানবতাকে সবার উপরে স্থান দিয়েছেন। জাত-পাত, ধর্ম, বর্ণের উর্দ্ধে মানুষ। অতএব ধর্মের ভিত্তিতে কো্ন পরিচয় নয়, আমার পরিচয় হোক “আমি মানুষ “। পরিচয় হোক ” আমরা মানুষ “।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.com
Design By Ahmed Jalal.
Design By Rana