বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:৩৬ অপরাহ্ন
নিউজ ডেস্ক, ইউনিভার্সেল নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম : ফিফা বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের জন্য স্টেডিয়ামসহ অবকাঠামো নির্মাণে মৃত শ্রমিকদের সংখ্যা অন্ধকারেরই থেকে গেল। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম মৃত্যুর সংখা হাজার হাজার বলা হচ্ছে। কিন্তু কাতারে শ্রমিকের মৃত্যুর তথ্য অপ্রকাশিত রয়ে গেছে। এরইমধ্যে বিশ্বকাপ ফুটবল টুর্নামেন্টের জন্য স্টেডিয়ামসহ অবকাঠামো নির্মাণে মৃত শ্রমিকদের সংখ্যা জানিয়েছেন কাতারের এক কর্মকর্তা। তিনি সরাসরি কাতারের বিশ্বকাপে আয়োজনে জড়িত ছিলেন। তার মতে, টুর্নামেন্টের অবকাঠামো নির্মাণে মৃত শ্রমিকদের সংখ্যা ৪০০ থেকে ৫০০ জন। এর আগে কাতার মৃত শ্রমিকদের যে সংখ্যার কথা বলেছিল তা থেকে অনেক বেশি। মঙ্গলবার মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি এ খবর জানিয়েছে।
কাতারের বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পালন করা সুপ্রিম কমিটির মহাসচিব হাসান আল-তাওয়াদি ব্রিটিশ সাংবাদিক পিয়ার্স মর্গানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মৃতদের এই সংখ্যার কথা তুলে ধরেছেন। এর ফলে মধ্যপ্রাচ্যে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ আয়োজনকারী কাতারের বিরুদ্ধে মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর সমালোচনা আরও জোরালো ও গতি পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
সাক্ষাৎকারে আল-তাওয়াদির কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল, বিশ্বকাপ আয়োজনের জন্য সব মিলিয়ে সত্যিকার অর্থে কতজন অভিবাসী শ্রমিকদের মৃত্যু হয়েছিল বলে আপনি মনে করেন?
জবাবে কাতারি কর্মকর্তা বলেন, মৃতদের সংখ্যা ৪০০ থেকে ৫০০ বলে ধারণা করা হয়। একেবারে নির্দিষ্ট সংখ্যা আমার জানা নেই। এটি আলোচনার বিষয়।
এরআগে কাতার আনুষ্ঠানিকভাবে মৃত অভিবাসী শ্রমিকদের নিয়ে কিছু বলেনি। সুপ্রিম কমিটির এক প্রতিবেদনে ২০১৪ থেকে ২০২১ সালের শেষ পর্যন্ত বিশ্বকাপের স্টেডিয়াম নির্মাণ ও সংস্কার কাজে মৃত শ্রমিকদের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়েছিল। এতে মৃত শ্রমিকের সংখ্যা মাত্র ৪০ জন বলে দাবি করা হয়। এর মধ্যে ৩৭ জন মৃত্যু হার্ট অ্যাটাকের মতো কাজ সংশ্লিষ্ট না এমন কারণে হয়েছে বলা হয়। আর মাত্র তিনজন কর্মস্থলের ঘটনায় মারা যান। আরেক পৃথক প্রতিবেদনে এক শ্রমিকের করোনাভাইরাসে মৃত্যু হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
আল-তাওয়াদি ইঙ্গিত দিয়েছেন ৪০০ থেকে ৫০০ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে টুর্নামেন্টের জন্য সব ধরনের অবকাঠামো নির্মাণ কাজে।
পরে এক বিবৃতিতে সুপ্রিম কমিটি বলেছে, আল-তাওয়াদি যে সংখ্যার কথা উল্লেখ করেছেন তা ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত কাতারজুড়ে কর্মস্থল সংশ্লিষ্ট সব মৃতের সংখ্যা। এই সংখ্যায় কাতারের সব খাত ও জাতীয়তা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
২০১০ সালে কাতার বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজনের অনুমতি পাওয়ার পর দেশের কর্মসংস্থান নীতিতে সংস্কার আনে। এর আওতায় কাফালা ব্যবস্থা বাতিল করা হয়। এই সময়ে ন্যূনতম মজুরি ১ হাজার কাতারি রিয়াল (২৭৫ ডলার) নির্ধারণসহ মালিকদের খাবার ও থাকার সুবিধা দেওয়া হয়। কর্মস্থলে মৃত্যু এড়াতে শ্রমকিদের নিরাপত্তা বিধিও হালনাগাদ করা হয়।
আল-তাওয়াদি বলেন, একজনের মৃত্যুতে অনেকের মৃত্যু হয়। এটি সহজ ও সাধারণ।
অ্যাক্টিভিস্টরা কাতারের প্রতি আরও বেশি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছেন। বিশেষ করে শ্রমিকরা যাতে মজুরি সময়মতো পায় এবং নিয়োগকর্তার হাতে নিপীড়িত না হয়।
বিশ্বের অন্যতম ধনী দেশ কাতার ২০১০ সালে বিশ্বকাপ আয়োজনের অনুমতি পায়। এরপরই থেকে দেশটিতে আকাশচুম্বী ভবন, হাইওয়ে, নতুন বিশ্ববিদ্যালয়, জাদুঘর, একটি নতুন বন্দর, সাতটি নতুন স্টেডিয়াম এবং একটি বন্দর পুনর্নির্মাণ করা হয়।
অধিকার গোষ্ঠী এবং সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, বিশাল এই নির্মাণ কর্মকাণ্ড চলাকালে হয়তো হাজার হাজার শ্রমিক মারা গেছে। তবে কাতার সরকার এই দাবিকে ‘আপত্তিকর ও উস্কানিমূলক’ বলে অভিহিত করেছে।
ফিফা ও আন্তর্জাতিক ইউনিয়নগুলো উপসাগরীয় দেশ কাতারকে শ্রমিকদের নিরাপত্তার উন্নতি, ন্যূনতম মজুরি প্রতিষ্ঠা, কর্মীদের চাকরি পরিবর্তন করার এবং দেশ ছেড়ে যাওয়ার আরও অধিকার দেওয়ার বিষয়ে মনোযোগ দিতে বলেছিল। কিন্তু কাতার তার আধুনিকীকরণের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ থাকায় বিষয়টি কানে তোলেনি। শেষ পর্যন্ত বিতর্কের অবসান ঘটাতে শ্রমিকদের তথ্য সংগ্রহের ব্যাপারে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা, ইউনিয়ন এবং বিদেশী সরকারগুলির চাপের সম্মুখীন হয় কাতার।
ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য গার্ডিয়ান ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারিতে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। তাতে দাবি করা হয় ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ভারত, বাংলাদেশ, নেপাল, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার ছয় হাজার ৫০০ কর্মী মারা গেছে।
কাতার সরকার এই প্রতিবেদনকে অসত্য বলে দাবি করেছিল। এমনকি কয়েকটি আন্তর্জাতিক সংস্থাও এই সংখ্যাকে ‘অতিরঞ্জিত’ বলে আখ্যা দিয়েছিল।
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের সিনিয়র গবেষক স্টিভ ককবার্ন বলেছেন, ‘কাতার শ্রমিকদের মৃত্যুর কারণগুলি পর্যাপ্তভাবে তদন্ত করতে ব্যর্থ হয়েছে, তাই কাতারের প্রচণ্ড গরমে কাজ করার ফলে ঠিক কতজন শ্রমিক মারা গেছে তা জানা খুব কঠিন, তবে সমস্যাটি যে অত্যন্ত গুরুতর তাতে কোন সন্দেহ নেই। বিশ্বকাপ এবং বিশ্বকাপ সংশ্লিষ্ট নয় এমন প্রকল্পগুলিতে গত এক দশকে হাজার হাজার শ্রমিকের মৃত্যুর তথ্য অপ্রকাশিত রয়ে গেছে এবং এর মধ্যে অন্তত শতাধিক অনিরাপদ কাজের পরিস্থিতির সাথে সম্পর্কিত হতে পারে।’
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply