বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:৫২ অপরাহ্ন
বিশেষ প্রতিনিধি, ইউনিভার্সেল নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম : জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ১০৩ তম জন্মবার্ষিকী ও জাতীয় শিশু দিবস পালনে পটুয়াখালীর বাউফলে শুক্রবার (১৭ মার্চ) বেলা ১১টার দিকে আয়োজিত আনন্দ র্যালীতে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও স্থানীয় এমপি আ.স.ম ফিরোজ গ্রুপ অস্ত্রে-সস্ত্রে সজ্জিত হয়ে সন্ত্রাসের তাণ্ডবলীলা চালিয়েছে। বাউফল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মোতালেব হাওলাদারকে হত্যাচেষ্টায় কুপিয়ে ও পিটিয়ে গুরুতর জখম করা হয়েছে। গুরুতর আহত অবস্থায় উপজেলা চেয়ারম্যানকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়েছে। বর্বরোচিত কায়দায় এহেন সন্ত্রাসী হামলায় উপজেলা চেয়ারম্যানের অনুসারীদের মধ্যে কমপক্ষে ২৫ জন আহত হয়েছেন।
উপজেলা যুবলীগের নেতা অরিবিন্ধু জানান, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মোতালেব হাওলাদারের নেতৃত্বে হাজার হাজার নেতা-কর্মী নিয়ে একটি আনন্দ মিছিল আওয়ামী লীগের কার্যালয় জনতা ভবনের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় পুলিশ উপজেলা পরিষদের গেটের সামনে বাধা দেয়। এসময় যুবলীগ সভাপতি ফয়সাল আহম্মেদ মনির মোল্লার নেতৃত্বে তাদের ওপর দেশীয় অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে সন্ত্রাসী হামলা করে। একইসঙ্গে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মোতালেব হাওলাদারকে টার্গেট করে তাঁকে হত্যাচেষ্টায় এলোপাথারি কুপিয়ে ও পিটিয়ে জখম করে।
প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রের ভাষ্য : উপজেলা চেয়ারম্যানকে হত্যাচেষ্টার সময় আ.স.ম ফিরোজ ছাদখোলা একটি গাড়িতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আ.স.ম ফিরোজের সামনেই উপজেলা চেয়ারম্যানকে কুপিয়ে জখম করা হয়েছে।
উপজেলা চেয়ারম্যান অনুসারী নেতাকর্মীদের মধ্যে বেশ কয়েকজন আহত হন। আহতদের মধ্যে রয়েছেন- ইমরান (৩০), পলাশ দাস (৩৭), গৌতম (৩৫), জাহিদ গাজী (৩০), নিজাম হাওলাদার (৪০), রাজিব (২৮), পলাশ (৩৬), হাসান (২৭), বেল্লাল (২২), রিপন, জলিল, গৌতম দাস, অমল চন্দ্র দাস, রাজা মিয়াসহ আরো অনেকে।
বাউফল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা এ এস এম সায়েম সাংবাদিকদের বলেন, উপজেলা চেয়ারম্যানের বুকের ডান পাশে ও ডান হাতের কনুইয়ের ওপরের অংশে জখম হয়েছে। পা ও মাথায় আঘাত পেয়েছেন। এবং তাঁর ডান হাতের তৃতীয় আঙুল কেটে চামড়ার সঙ্গে ঝুলে আছে। প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন বাউফল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের চিকিৎসা কর্মকর্তা।
হামলার ঘটনায় বাউফল শহরের থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আধা ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও পাল্টাপল্টি ধাওয়া। আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো শহরে। যানবাহন চলাচল ও দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়।
হামলার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হলে দুপুর ১২টার দিকে আসম ফিরোজ এমপির নেতৃত্বে আনন্দ মিছিল বের করে। মিছিলটি শহরের বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিন করে।
বাউফল উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মোতালেব হাওলাদার অনুসারীদের অভিযোগ- পুলিশ-প্রশাসনের উপস্থিতিতে এইরকম ন্যাক্কারজনক সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে আ.স.ম ফিরোজ গ্রুপের গুণ্ডাবাহিনী। হামলার সময় উপজেলা প্রশাসন এবং পুলিশের ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। প্রশাসনের পক্ষপাতিত্বের কারণে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকী পালন উপলক্ষে আয়োজিত আনন্দ র্যালীতে আ.স.ম ফিরোজের ব্যানারে থাকা সন্ত্রাসীরা অস্ত্রসস্ত্র নিয়ে সন্ত্রাসী হামলা চালাতে পেরেছে। মোতালেব হাওলাদার অনুসারী কর্মী-সমর্থকরা বলছেন, হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙ্গালী, স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে সন্ত্রাসী হামলা চালানোর বিষয়টি কোনভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এটা আমাদের হৃদয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছে। জাতির জনকের অনুষ্ঠানে হামলা চালানো মানে জাতির জনকের ওপর হামলা, তাঁর পরিবারের ওপর হামলা। সর্বোপরি এই বর্বরোচিত সন্ত্রাসী হামলা আওয়ামী লীগের ওপর হামলা।
আজকে যে বা যারা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে হামলার নেপথ্যে থেকে কলকাঠি নেড়েছে, তারাই ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার সঙ্গে জড়িত। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা শেষে আ.স.ম ফিরোজ এর নেতৃত্বে সেদিন বরিশালে আনন্দ মিছিলও বের করেছিল।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর ১০৩ তম জন্মবার্ষিকী অনুষ্ঠানে বর্বর হামলার ঘটনায় গভীর ক্ষোভ প্রকাশ করে উপজেলা চেয়ারম্যান মোতালেব হাওলাদার সমর্থকরা এ বিষয়ে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার আশু দৃষ্টি কামনা করে বলেছেন, সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার শীর্ষ পর্যায়ের তদন্ত সাপেক্ষে বর্তমান এমপি আ.স.ম ফিরোজ, ইউএনও, ওসির বিরুদ্ধে যথাযথ প্রক্রিয়ায় কঠিন থেকে কঠিনতর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। তাঁরা দ্রুত বাউফল থেকে ইউএনও ও ওসিকে বরখাস্ত করার দাবি জানিয়েছেন।
পুলিশের ভাষ্য, পরিস্থিতি শান্ত করতে পুলিশ কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে। এসময় ইটপাটকেলের আঘাতে পুলিশের ওসি আলম মামুন, এসআই মনিরুজ্জামান, এসআই হুমায়ন কবির, এসআই আবুল বশার, এস আই আবুল হাসান, এএসআই শাহিন, কনেস্টবল রাহাত, রবিউল আহত হয়েছেন।
বাউফল থানার ওসি আল মামুন বলেন, ‘এই কর্মসূচীর নিরাপত্তা বিধানের জন্য শহরে বিপুল সংখ্যক পুলিশ মোতায়ন ছিল। ঘটনার সময় সংহিসতা মোকাবেলা করতে বেশ কয়েক রাউন্ড রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে উভয় পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়া হয়। এসময় আমিসহ কয়েক পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন।’
বাউফলের ইউএনও আল আমিন বলেন, ‘দুই পক্ষকেই সহ অবস্থানের অনুরোধ করা হয়েছিল। তারা আমাকে কথাও দিয়েছিলেন শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি পালন করবেন। কিন্তু তারা কথা রাখেননি। আমি হাতজোড় করে তাদেরকে অনুরোধ করেছি। তারা আমার কথা শুনেননি।’
বলাবাহুল্য, ১৭ মার্চ দিবসটি উপলক্ষে উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যালয়ে (জনতা ভবন) একই সময় এই পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। গত ৯ মার্চ উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও উপজেলা আ’লীগের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল মোতালেব হাওলাদার উপজেলা প্রশাসন বরাবর চিঠি দিয়ে প্রথমে এ কর্মসূচির ঘোষণা দেন। এবং তাঁর স্বাক্ষরিত দাওয়াতপত্রও বিতরণ করা হয়।
অপরদিকে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মদিন ও জাতীয় শিশু দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে (জনতা ভবন) সকাল ৯ টায় সাংসদ আ স ম ফিরোজ গ্রুপের নেতা-কর্মীরা কেক কাটা ও আনন্দ শোভাযাত্রার আয়োজনের ঘোষণা দেন। গত ১২ মার্চ উপজেলা আওয়ামী লীগ এর সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক দিবস উদ্যাপন কমিটির আহ্বায়ক ইব্রাহিম ফারুক সাক্ষরিত উপজেলা প্রশাসন বরাবর একটি চিঠির মাধ্যমে একইস্থানে একই সময় পাল্টা কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হয়। ১৩ মার্চ থেকে আ স ম ফিরোজের পক্ষে দিবসটি পালনে ইব্রাহিম ফারুক স্বাক্ষরিত দাওয়াতপত্র বিতরণ করা হয়। যদিও দাওয়াতপত্রে ইব্রাহিম ফারুক উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নিজেকে দাবি করেছেন।
অন্যদিকে, জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও বাউফল পৌর মেয়র আ’লীগ নেতা জিয়াউল হকের নেতৃত্বে একই দিনে বাউফল প্রেসক্লাব সড়কের পাশে দিবস উদ্যাপন উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি ঘোষণা দেন।
মূলত: এরপর থেকে উত্তেজনা বিরাজ করছিল।
প্রসঙ্গত : দীর্ঘ সময়ব্যাপী উপজেলা আওয়ামী লীগের মধ্যকার বিভাজন চলে আসছে। ২০১২ সাল থেকে আওয়ামী লীগের দলীয় বিভাজন মাথাচাড়া দিয়ে উঠে। যদিও এরও আগ থেকে বাউফল আওয়ামী লীগে অভ্যন্তরীন কোন্দলে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অপ্রতিকর ঘটনার জন্ম দেয়।
এরমধ্যে সাংসদ আ স ম ফিরোজ ও আবদুল মোতালেব হাওলাদার একই প্লাটফর্মে রাজনীতি করতেন। এদের বিপরীত গ্রুপ ছিলেন পৌর মেয়র জিয়াউল হক এবং সাবেক উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য মুজিবুর রহমান। অবশ্য এরবাইরেও বাউফল আওয়ামী লীগে আরো গ্রুপ রয়েছে।
একপর্যায়ে আ স ম ফিরোজ ও আবদুল মোতালেব হাওলাদার এর মধ্যকার দুটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে পড়ে। ২০২১ সালে আ স ম ফিরোজ ও আবদুল মোতালেবের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে জোরেশোরে চাউর হয়। ২০২২ সালের ৬ মে আ স ম ফিরোজ গ্রুপ ও আবদুল মোতালেব হাওলাদার গ্রুপ একইস্থানে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করায় উত্তেজনা বিরাজ করেছিল। তৎকালীন সময়ে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হন।
বাউফল থানা-সংলগ্ন সড়কের ওপর তোরণ নির্মাণকে কেন্দ্র করে ২০২০ সালের ২৪ মে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষে যুবলীগ কর্মী তাপস নিহত হন।
বর্তমানে বাউফল আওয়ামী লীগে তিনটি গ্রুপ দৃশ্যমান। একপক্ষের নেতৃেত্ব সাংসদ আ স ম ফিরোজ। আরেকপক্ষের নেতৃত্বে উপজেলা চেয়ারম্যান আবদুল মোতালেব হাওলাদার। অপর আরেকটি পক্ষের নেতৃত্বে পৌর মেয়র জিয়াউল হক।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply