বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:১২ অপরাহ্ন
আহমেদ জালাল, ইউনিভার্সেল নিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম: মাহসা আমিনির অপরাধ ছিল, ঠিকভাবে হিজাব না পরা; আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, চুল দেখা যাচ্ছিল তাঁর। ইরানে প্রচলিত শরিয়া আইন অনুযায়ী নারীদের হিজাব পরা বা চাদর দিয়ে মাথা ঢাকা বাধ্যতামূলক। এছাড়া নারীদের শরীর সম্পূর্ণ ঢেকে রাখতে পা পর্যন্ত লম্বা ও ঢিলা পোশাক পরার বিধান দেশটিতে রয়েছে। তেহরানে ১৩ই সেপ্টেম্বর এই নৈতিকতা রক্ষা পুলিশ যখন মিজ আমিনিকে গ্রেপ্তার করে তখন হিজাবের তলা দিয়ে তাঁর কিছু চুল দেখা যাচ্ছিল বলে অভিযোগ করা হয়। একটি আটক কেন্দ্রে তাঁকে নিয়ে যাবার অল্পক্ষণ পরই মাশা আমিনি অজ্ঞান হয়ে কোমায় চলে যান। তিন দিন পর তিনি হাসপাতালে মারা যান। ইরানে মাহসা আমিনিকে নির্যাতনে হত্যার অভিযোগ উঠে। এরপর থেকে মাহসা আমিনি হত্যায় হিজাব বিরোধী আন্দোলন সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। ক্ষোভে ফেটে পড়েন আন্দােলনকারীরা। নারী জাগরণে অগ্নিগর্ভ হয়ে উঠে গোটা ইরান। অফিসাররা তাঁর মাথায় লাঠির বাড়ি মেরেছে এবং তাদের একটি গাড়িতে মিজ আমিনির মাথা ঠুকে দিয়েছে এমন অভিযোগ পুলিশ বাহিনী থেকে অস্বীকার করা হয়। সূত্র : বিবিসি বাংলা।
গাশ্ত-ই এরশাদ নামে বিশেষ এই নজরদারি পুলিশ বাহিনীর একজন অফিসার নাম পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে বিবিসিকে দেয়া একটি একান্ত সাক্ষাৎকারে ওই বাহিনীতে তার কাজ করার অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন। “ওরা আমাদের বলে যে নারীদের রক্ষা করার লক্ষ্যে আমরা পুলিশের এই নৈতিকতা রক্ষা বাহিনীতে কাজ করছি,” তিনি বলেন। “কারণ নারীরা যদি ঠিকমত পোশাক আশাক না পরে, তাহলে পুরুষরা উত্তেজিত হবে এবং ওই নারীদের ক্ষতি করবে।”
তিনি বলেন, তারা ছয় জনে দলে কাজ করেন। দলে থাকেন চারজন পুরুষ এবং দুজন নারী পুলিশ। যেসব এলাকায় মানুষ পায়ে হেঁটে বেশি চলাচলা করে এবং যেসব এলাকায় মানুষের ভিড় বেশি হয়, সেসব এলাকার ওপর তারা বেশি নজর রাখেন।
“ব্যাপারটা অবশ্য একটু অদ্ভুত। কারণ আমাদের কাজের লক্ষ্য যদি হয় মানুষকে নির্দেশগুলো বোঝানো, সেগুলো মানতে বলা, তাহলে আমরা কেন জনাকীর্ণ এলাকাগুলো বেছে নিচ্ছি? প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে কি আমরা এমন জায়গা বেছে নিচ্ছি যেখানে বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা যাবে?”
“মনে হতে পারে আমরা শিকারের সন্ধানে যাচ্ছি।”
পুলিশ অফিসার বলেন, পোশাক বিধি লংঘন করছে এমন যথেষ্ট সংখ্যক মানুষকে ধরতে না পারলে তাকে তার ঊর্ধ্বতন কমান্ডারের তিরস্কারের মুখে পড়তে হয়, বা শুনতে হয় যে সে ঠিকমত দায়িত্ব পালন করছে না। তিনি আরও বলেন মানুষকে গ্রেপ্তার করার সময় যখন তাদের বাধার মুখে পড়তে হয়, সেটা তার জন্য বিশেষ করে সমস্যার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
“তারা জানে, আটক করে আমরা তাদের জোর করে পুলিশের ভ্যানে ওঠাব। এ কাজ করার সময় বহুবার আমার চোখে পানি চলে এসেছে।
“আমি তাদের বলতে চেয়েছি আমি ঠিক ওদের একজন নই। আমরা বেশিরভাগই সাধারণ সৈনিক- আমাদের বাধ্য হয়ে দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। আমার খুবই খারাপ লাগে।”
যারা হিজাব ঠিকমত পরে না বা ইসলামি রীতি মেনে সাজপোশাক করে না, ইরানি কর্তৃপক্ষ তাদের “হিজাব ঠিকমত না পরার” বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করে ১৯৭৯ সালের ইসলামী বিপ্লবের পরপরই। ওই বিপ্লবের একটা বড় লক্ষ্য ছিল নারীদের খোলামেলা সাজপোশাক বন্ধ করা।
যদিও সেসময় ইরানের অনেক নারীই ইসলামি রীতি অনুযায়ী পোশাক পরতেন, কিন্তু পশ্চিমাপন্থী শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলাভিকে ক্ষমতাচ্যুত করার আন্দোলনের আগে তেহরানের রাস্তায় নারীদের খাটো স্কার্ট পরে এবং মাথা না ঢেকে চলাফেরা করতে দেখা যেত।
তার স্ত্রী ফারাহ, যিনি প্রায়শই পশ্চিমা পোশাক পরতেন, তাকে ইরানে আধুনিক নারীর একজন আদর্শ হিসাবে মনে করা হতো।
ইরান ইসলামী প্রজাতন্ত্রে পরিণত হবার কয়েক মাসের মধ্যেই শাহ-এর শাসনামলে নারীদের অধিকার সুরক্ষিত করে যেসব আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল সেগুলো তুলে নেবার প্রক্রিয়া শুরু হয়।
“সেটা অবশ্যই রাতারাতি হয় নি, সেটা পর্যায়ক্রমে ঘটেছে,” বলছেন মেহেরাঙ্গিজ কার, যিনি ৭৮ বছর বয়স্ক একজন মানবাধিকার আইনজীবী এবং আন্দোলনকারী। দেশটির প্রথম হিজাব-বিরোধী বিক্ষোভ আয়োজনে তিনি সহযোগিতা করেছিলেন। “বিপ্লবের ঠিক পরে পরেই, রাস্তায় রাস্তায় পুরুষ ও নারীরা উপহারের মোড়কে মুড়ে নারীদের হিজাব বিলি করতেন।”
আয়াতোল্লাহ রুহুল্লা খোমেইনি ১৯৭৯ সালের ৭ই মার্চ ডিক্রি বা নির্দেশনামা জারি করেন যে, সব নারীকে তাদের কর্মক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে হিজাব পরতে হবে এবং নারীরা মাথা না ঢাকলে তার বিচারে সেইসব নারী ”নগ্ন” বলে গণ্য হবেন।
“তার সেই ভাষণকে বহু বিপ্লবী, নারীদের হিজাব পরতে বাধ্য করার নির্দেশ হিসাবে গ্রহণ করেছিল,” বলছেন মিসেস কার, যিনি এখন থাকেন আমেরিকায় ওয়াশিংটন ডিসিতে। “অনেকেই মনে করেছিল এই নির্দেশ রাতারাতি কার্যকর করা হচ্ছে। তাই নারীরা বিরোধিতা শুরু করেছিল।”
এই নির্দেশে তাদের প্রতিক্রিয়া ছিল তাৎক্ষণিক। আয়াতোল্লাহ খোমেইনির ভাষণের পরদিনই বিক্ষোভ জানাতে তেহরানের রাস্তায় জড়ো হন এক লাখের ওপর মানুষ, যাদের বেশিরভাগই ছিল নারী। সেদিন ছিল আন্তর্জাতিক নারী দিবস।
আয়াতোল্লাহ খোমেইনি ডিক্রি জারি করার পরও, নারীর “সঠিক” পোশাক কী হওয়া উচিত সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে কর্তৃপক্ষের বেশ কিছু সময় লেগেছিল। “কোন স্পষ্ট নির্দেশ ছিল না এ ব্যাপারে। ফলে তারা বিভিন্ন অফিসের দেওয়ালে ঝোলানো মডেলদের ছবি দিয়ে পোস্টার আর ব্যানার তৈরি করে আনল। তারা বলল নারীদের হিজাব পরার ব্যাপারে নির্দেশগুলো মানতে হবে, না হলে তাদের ঢুকতে দেয়া হবে না,” বলেন মিসেস কার।
১৯৮১ সালে নারী ও কিশোরীদের ইসলামি রীতি অনুযায়ী আব্রু রক্ষা করার উপযোগী পোশাক পরা আইনত বাধ্যতামূলক করা হল। এর অর্থ হল নারীদের চাদর পরতে হবে অর্থাৎ তাদের পা অবধি পুরো শরীর ঢাকা ঢিলা পোশাক পরতে হবে এবং তার সাথে পারলে নিচে ছোট একটা স্কার্ফ পরতে হবে। অথবা পুরোদস্তুর হিজাব এবং তার সাথে লম্বা হাতা ওভারকোট দিয়ে শরীর ঢাকতে হবে।
“তবে ব্যক্তিগত পর্যায়ে বাধ্যতামূলকভাবে হিজাব পরার বিরুদ্ধে লড়াই চলতেই থাকে। মাথা ঢাকার স্কার্ফ পরার ব্যাপারে অথবা চুল সঠিকভাবে পুরোপুরি না ঢাকার ব্যাপারে আমরা সৃজনশীল হয়ে উঠি,” বলেন মিসেস কার।
পার্লামেন্ট ১৯৮৩ সালে সিদ্ধান্ত নিল যেসব নারী প্রকাশ্যে মাথা ঢাকবে না, তাদের শাস্তি হিসাবে ৭৪ বার বেত্রাঘাত করা হবে। আরও সম্প্রতি এই সাজার সঙ্গে আরও যোগ হয়েছে ৬০ দিন পর্যন্ত কারাবাস।
তবে এরপরেও তখন থেকেই এই আইন পুরোপুরি কার্যকর করতে কর্তৃপক্ষকে বেগ পেতে হয়েছে। সব বয়সের নারীকেই প্রায়ই দেখা যাচ্ছে রাস্তাঘাটে বা প্রকাশ্যে সীমানা লংঘন করে আঁটোসাঁটো জামা বা উরু পর্যন্ত ঝুলের খাটো কোট পরতে। সেইসঙ্গে উজ্জ্বল রং-এর হেডস্কার্ফ এমনভাবে পেছনের দিকে ঠেলে পরতে – যাতে তাদের চুলের অনেকটা অংশ বেরিয়ে থাকে।
কুর্দিস তরুণী মাহসা আমিনি গত ১৩ সেপ্টেম্বর তাঁর ভাইয়ের সঙ্গে ইরানের কুর্দিস্তান থেকে রাজধানী তেহরান যাচ্ছিলেন। যাওয়ার পথে আমিনিকে গ্রেপ্তার করে দেশটির নৈতিকতা বিষয়ক পুলিশ। মাহসা আমিনির অপরাধ ছিল, ঠিকভাবে হিজাব না পরা; আরও নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, চুল দেখা যাচ্ছিল তাঁর। আমিনি পুলিশি হেফাজতে থাকা অবস্থায় ১৬ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে মারা যান।
পরিবারের অভিযোগ পুলিশের নির্যাতনে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ অবশ্য বলছে, হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা গেছেন আমিনি; এতে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর কোনো দায় নেই।
সারাবিশ্বে এ ঘটনায় নিন্দার ঝড় শুরু হয়েছে। দেশটির রক্ষনশীল সরকার বিক্ষোভ দমনে ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামসহ বেশ কয়েকটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বন্ধ করে দিয়েছে। দেশের কোথাও কোথাও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে ইন্টারনেট সংযোগও।
ইরানে প্রচলিত শরিয়া আইন অনুযায়ী, নারীদের হিজাব পরা বা চাদর দিয়ে মাথা ঢাকা বাধ্যতামূলক। এছাড়াও নারীদের শরীর সম্পূর্ণ ঢেকে রাখতে পা পর্যন্ত লম্বা ও ঢিলা পোশাক পরার বিধান দেশটিতে রয়েছে। পোশাক ঠিকভাবে না পরার দোহায় দিয়ে নারীদের ওপর নির্যাতন চালানোর অভিযোগ এই পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে কেবল এখনই নয়, এর আগেও অনেকবার উঠেছে।
এই অপ্রত্যাশিত মৃত্যুর ঘটনায় ইরানের নারী ও সাধারণ মানুষ ফেটে পড়েছে ক্ষোভে। সারাদেশে ১০০টিরও বেশি শহরে চলছে বিক্ষোভ। নারীরা তাদের হিজাব পুড়িয়ে, চুল কেটে প্রতিবাদ জানাচ্ছেন। আন্দোলনে পুরুষদের অংশগ্রহণও চোখে পড়ার মত। ২০১৭ সালে ৪২ বছর বয়সী নারী শাপারককে হিজাব না পরার অপরাধে ২ বছর সশ্রম কারাদণ্ডসহ ২০ বছরের কারাদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। পরে তিনি অবশ্য দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। প্রতিবছর আমিনি বা শাপারকের মত নারীদের সঙ্গে এমন ঘটনা অহরহই ঘটে চলেছে ইরানে। আর এসব ঘটনাকে ইসলামের দোহায় দিয়ে সমর্থন দিচ্ছে সে দেশের কর্তৃপক্ষ। ১৯৭৯ সালে ইসলামি বিপ্লবের পর নারীদের জীবন যাপনে ব্যাপক পরিবর্তন আসে। যারা ঠিকমতো হিজাব পরতেন না বা ইরানে প্রচলিত ইসলামি রীতি মেনে পোশাক পরিচ্ছদ করতেন না, তাদের প্রতি কঠোর হতে শুরু করে ইরানের কর্তৃপক্ষ। এই বিপ্লবের একটি বড় লক্ষ্যই ছিল নারীদের খোলামেলা সাজগোছ ও পোশাক পরিচ্ছদ বন্ধ করা। ইসলামি বিপ্লবী সরকারের আমলে নারীদের বর্তমান রাজনীতিতে অংশগ্রহণ তেমন দেখা যায় না। ২০০৮ সাল পর্যন্ত নারীরা স্টেডিয়ামে গিয়ে পুরুষ দলের ফুটবল খেলা দেখতে পারতেন না। এটি আইন করে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এমনটি নয়; তবে তাদেরকে স্টেডিয়ামে ঢুকতে দেওয়া হতো না। এমন নানান ক্ষেত্রে ইরানের নারীদের ওপর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইরানের সরকারকে তীব্র সমালোচনায় বিদ্ধ করেছে
বর্তমান অনলাইনের যুগে ইরানের নারীরা তাদের অধিকার আদায়ে অনেক বেশি সচেতন ও সংগঠিত। নারী অধিকার আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ অনলাইন প্লাটফর্ম ব্যবহার করে নারীদের সচেতন করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। প্রবাসী ইরানি নারীরা এ ব্যাপারে সবচেয়ে বেশি কাজ করছেন। বাঙালি নারী জাগরণের অগ্রদূত, মানবতাবাদী বেগম রোকেয়া সর্বদাই সমাজে সাম্যের কথা বলেছেন, তাঁর স্বপ্ন ছিল সমাজে নারী ও পুরুষ যাতে একসঙ্গে সমান মর্যাদা এবং অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারে। আদর্শ সমাজ বিনির্মাণের কথা তিনি বলেছেন, ‘আমরা সমাজের অর্ধাঙ্গ, আমরা পড়িয়া থাকিলে সমাজ উঠিবে কীরূপ? কোনো ব্যক্তি এক পা বাঁধিয়া রাখিলে সে খোঁড়াইয়া খোঁড়াইয়া কতদূর চলিবে? পুরুষের স্বার্থ এবং আমাদের ভিন্ন নহে। তাহাদের জীবনের উদ্দেশ্য বা লক্ষ্য যাহা আমাদের লক্ষ্য তাহাই।’আমিনি বা শাপারকের মত নারীদের সঙ্গে এমন ঘটনা অহরহই ঘটে চলেছে ইরানে
অথচ ১৯৭৯ সালের আগে ইরানি নারীদের জীবন ছিল এখনকার চেয়ে সম্পূর্ণই আলাদা। তখন পশ্চিমা নারীদের মত ইচ্ছেমতো পোশাক পরা ও চলাফেরার স্বাধীনতা পেতেন নারীরা।
আশির দশকের আগে ইরানের নারীরা শিক্ষা, কর্ম, খেলাধুলাসহ অনেক কিছুতেই অগ্রসর ছিলেন। পশ্চিমা নারীদের সমকক্ষ ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মত। ফুটবলসহ নানান খেলাধুলায় নারীদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল।
আঁটসাঁট জিন্স, মিনি স্কার্ট, স্নান পোশাকসহ সবধরনের পোশাকে নারীদের দেখা পাওয়া যেত। তবে সে সময়ে যে হিজাব পরা হতো না এমনটিও নয়, বরং সে সময়ে অধিকাংশ নারী হিজাব পরতো।
১৯৩৬ সালে তৎকালীন পাহলভি সরকার হিজাব নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। এটি নিয়েও সেকালে বিক্ষোভ হয়েছিল ইরানে। বলা হয়েছিল, এটা নারী স্বাধীনতার হস্তক্ষেপ। কারণ যারা নিয়মিত হিজাব পরেন, তারা হঠাৎ করেই হিজাব ছাড়া বাইরে আসতে স্বস্তি বোধ করবেন না। সুতরাং, এটি ধর্মীয় স্বাধীনতার লঙ্ঘন।
১৯৭৯ সালের ৭ মার্চ আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেইনি নারীর পোশক সংক্রান্ত এক ডিক্রি বা নির্দেশনা জারি করেন। ডিক্রিতে বলা হয়, নারীদের কর্মক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক হিজাব পরতে হবে এবং নারীরা মাথা না ঢাকলে, তা অশ্লীলতা হিসেবে গণ্য হবে। এ সময় নারী-পুরুষরা উপহারের মোড়কে মুড়ে রাস্তায় রাস্তায় হিজাব বিলি করতে শুরু করে।
তবে খামেনির ভাষণের পরদিন ছিল ৮ মার্চের আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এদিন হিজাব পরা বাধ্যতামূলক সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এক লাখ নারী-পুরুষ এক হয়ে ইরানে বিক্ষোভ করে।
১৯৭৯ সালের পর শুধু নারীদের পোশাকের ওপরেই নিয়ন্ত্রণ চাপানো হয়নি; নিয়ন্ত্রণ আরোপ হয় তাদের উচ্চশিক্ষা গ্রহণে, খেলাধুলায়, রাজনীতিতে, কর্মক্ষেত্রে, এমন কি ব্যক্তিগত ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়।ইসলামি বিপ্লবী সরকারের আমল
ইরানের ইসলামিক কোডের প্রাদেশিক অনুচ্ছেদ ৬৩৮ অনুযায়ী ‘মহিলারা যদি জনসম্মুখে বা রাস্তায় হিজাব পরিধান না করে, তবে তার শাস্তি হিসেবে তাদের ২ দিন থেকে ১০ মাস পর্যন্ত কারাভোগ অথবা ৫০,০০০ থেকে ১০ লাখ রিয়াল পর্যন্ত জরিমানা পরিশোধ করতে হবে’।
ইসলামি বিপ্লব পরবর্তী বিভিন্ন সময়ে নারীরা তাদের নিয়ন্ত্রণের বিরুদ্ধে অনেকবার বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। কিন্তু প্রতিবার তাদেরকে দমন করা হয়েছে। এর আগে, সর্বশেষ ২০১৯ সালের হিজাব বিরোধী বিক্ষোভ দমন-পীড়নের মাধ্যমে সামাল দেওয়া হয়।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো ইরানের সরকারকে তীব্র সমালোচনায় বিদ্ধ করেছে। জাতিসংঘ নিরপেক্ষ তদন্তের আহবান জানিয়েছে। তবে এই আহ্বান কতোটা কাজে দেবে সে এক প্রশ্ন! বিশ্বের কোথাও কিছু হলে সবচেয়ে শক্তিধর এই সংগঠনকে কেবল ‘সুষ্ঠু তদন্তের আহ্বান’, ‘তীব্র নিন্দা জানানো’, ‘বিচারের আহ্বান’- ইত্যাদি জানানো ছাড়া আর তেমন কিছুই করতে দেখা যায় না। যেনো এতটুকুতেই দায়িত্ব সীমাবদ্ধ এই সংগঠনের।খাঁচায় বন্দি পাখির মতো পরাধীনতার শিকলবেড়িই আমৃত্যু বয়ে বেড়ানো!
#আজও এই বঙ্গদেশ তথা পুরো ভারতবর্ষ সহ বিশ্বে দৃশ্যমান অন্ধকারাচ্ছন্ন রক্ষণশীল সমাজে মুসলিম পরিবারে নারীর জীবন মানেই পর্দার আড়ালে ‘বন্দি জীবন’! অর্থাৎ নারীর নিজের জীবনের কোনো সিদ্ধান্তই নিজে নেবার স্বাধীনতা নেই; খাঁচায় বন্দি পাখির মতো পরাধীনতার শিকলবেড়িই আমৃত্যু বয়ে বেড়ানো!!
#মাহসা আমিনি হত্যা : ইরানে নারী জাগরণ #আলোর মশাল।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply