বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:১২ অপরাহ্ন
আহমেদ জালাল : বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঊষালগ্নে উনসত্তরের গণ-অভ্যুত্থানে আত্মদানকারী শহীদ বুদ্ধিজীবী ড. সৈয়দ মোহাম্মদ শামসুজ্জোহা । তৎকালীন সময়ে তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রক্টর ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের পাকিস্তানি সেনাদের গুলি থেকে বাঁচাতে গিয়ে শহীদ হন তিনি। ছাত্রদের উদ্দেশ্যে চালানো গুলি তিনি নিজ বুকে পেতে নিয়েছিলেন। জাতির এই মহান শিক্ষককে পাকিস্তানি সেনারা গুলি করেই ক্ষান্ত হয়নি, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছিল। যাঁর আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে গণ-আন্দোলনের দাবানল গোটাদেশে ছড়িয়ে পড়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিক্ষুব্ধ ছাত্রদের পাকিস্তানি সেনাদের গুলি থেকে বাঁচাতে গিয়ে শহীদ হন তিনি। ছাত্রদের উদ্দেশ্যে চালানো গুলি তিনি নিজ বুকে পেতে নিয়েছিলেন। জাতির এই মহান শিক্ষককে পাকিস্তানি সেনারা গুলি করেই ক্ষান্ত হয়নি, বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করেছিল।
একজন আদর্শ শিক্ষকের নাম ড. জোহা। রাবি শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে যিনি হাত উঁচিয়ে পাকিস্তানি সেনাদের বলেছিলেন, ‘প্লিজ, ডোন্ট ফায়ার! আমার ছাত্ররা এখনই চলে যাবে…!’ তিনি বলেছিলেন , ‘কোনো ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে যেন আমার গায়ে গুলি লাগে।’ তিনি নিজের জীবন দিয়ে হাজার হাজার ছাত্রছাত্রীর জীবন বাঁচিয়ে ছিলেন। শিক্ষার্থীদের প্রতি একজন শিক্ষকের কতটুকু দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ থাকা উচিত, অধ্যাপক ড. জোহা জীবন দিয়ে এক মহান দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন।
১৯৬৯ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের হামলায় অনেক ছাত্র আহত হয়। ওইদিন সন্ধ্যায় রাবির কলাভবনে বাংলা বিভাগের এক অনুষ্ঠানে সকলের সামনে ছাত্রদের রক্তে রঞ্জিত শার্ট দেখিয়ে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে তিনি বললেন, “আহত ছাত্রদের পবিত্র রক্তের স্পর্শে আমি উজ্জীবিত। এরপর আর যদি বিশ্ববিদ্যালয়ে গুলি হয়, সেই গুলি কোনো ছাত্রের গায়ে লাগার আগে আমার বুকে বিঁধবে।”
১৯৬৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়–সংলগ্ন নাটোর রোডে পরিকল্পিতভাবে আন্দোলন দমাতে স্থানীয় প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। প্রতিবাদী ছাত্রসমাজ ১৪৪ ধারা ভাঙার প্রস্তুতি নেন। সশস্ত্র বাহিনী বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটে প্রস্তুত রাখা হয়। আন্দোলনরত ছাত্ররা সব প্রতিরোধ ভেঙ্গে মেইন গেটের প্রাচীর টপকে বের হয়ে পড়েন। এরকম পরিস্থিতিতে স্বাধীনতাকামী ছাত্রদের বিরুদ্ধে সামরিক বাহিনী রাইফেল উঁচিয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকলে ছাত্ররা তাঁদের গাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেন। এরকম অবস্থায় পাকিস্তানি সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হাদির সঙ্গে জোহা কথা বলার জন্য এগিয়ে যান। তাঁকে অনুরোধ করেন যেন পাকিস্তানের সেনাদের পক্ষ থেকে কোনো ধরনের মারাত্মক পদক্ষেপ নেওয়া না হয়। মেইন গেট–সংলগ্ন নাটোর রোডে ছাত্রদের ঢল নামতে শুরু করলে পাকিস্তানি মিলিটারি বাহিনী ছাত্রদের ওপর গুলি করতে উদ্যত হয়।
তখন অধ্যাপক জোহা হাত উঁচু করে মিলিটারিদের উদ্দেশে বলতে থাকেন, ‘প্লিজ, ডোন্ট ফায়ার! আমার ছাত্ররা এখান থেকে এখনই চলে যাবে…!’
জোহা সেনাসদস্যদের শান্ত থাকতে আহ্বান জানান। সেদিন পাকিস্তানি বাহিনী তাঁর কোন অনুরোধ শোনেননি।
বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে , রাইফেল দিয়ে গুলি করে তাঁকে আহত করে পাকিস্তানি বাহিনী। তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর অস্ত্রোপচার টেবিলে অধ্যাপক শামসুজ্জোহা মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। তিনি জীবন দিয়ে নির্ধারণ করে গেছেন, শিক্ষার্থীদের প্রতি একজন শিক্ষকের কতটুকু দায়িত্ব ও কর্তব্যবোধ থাকা উচিত।
ড. শামসুজ্জোহা ছিলেন একজন গবেষক, শিক্ষক এবং বলিষ্ঠ নেতৃত্বের অধিকারী। তিনি ছিলেন ক্রীড়াপ্রেমী। রসায়ন শাস্ত্রের উন্নয়নে তাঁর অবদান অসামান্য। ড. শামসুজ্জোহা ১৯৬১ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে প্রভাষক পদে যোগদান করেন। ১৯৬২ সালে উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি লন্ডনের ইমপেরিয়াল কলেজে যান। ১৯৬৪ সালে তিনি পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। ১৯৬৬ সালে রিডার পদে পদোন্নতি লাভ করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শাহ মখদুম হলের প্রাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন ড. শামসুজ্জোহা। ১৯৬৬-১৯৬৮ সালে বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রশ্নে পূর্ব পাকিস্তানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীরবিরুদ্ধে পূর্ব বাংলায় গণ-আন্দোলন শুরু হয়। ১৯৬৯ গণআন্দোলনের প্রেক্ষাপটে ড. জোহা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর ছিলেন।
১৯৩৪ সালের ১ মে পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলায় জন্মগ্রহণ করেন জোহা । ১৯৪৮ সালে প্রথম শ্রেণিতে ম্যাট্রিকুলেশন ও ১৯৫০ সালে প্রথম শ্রেণিতে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন তিনি। এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ড. শামসুজ্জোহা ভাষাআন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।
আজকে স্বাধের স্বাধীন বাংলাদেশে ভিসি/প্রক্টররা ক্যাম্পাসে গুণ্ডা ডেকে এনে শিক্ষার্থীদের বেওনেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ক্ষতবিক্ষত করা হচ্ছে!! সবকিছুকে ছাপিয়ে ড. শামসুজ্জোহা শিক্ষার্থীদের আপন অভিভাবক হতে সক্ষম হতে পেরেছিলেন।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply