বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৫:৫৭ অপরাহ্ন
ইউনিভার্সেল নিউজ ডেস্ক : ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং ৯২ বছর বয়সে মারা গেছেন। অর্থনীতিবিদ থেকে রাজনীতিতে নাম লেখানো কংগ্রেসের বর্ষীয়ান এই রাজনীতিবিদের মৃত্যুতে বিশ্ব নেতারা শোক প্রকাশ করেছেন। বিশ্ব নেতারা তার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, সততা এবং ভারতের উন্নয়নের নেপথ্যে অবদানের প্রশংসা করেন। ভারতের উদার অর্থনীতির ‘স্থপতি’ হিসেবে বিবেচনা করা হয় শিখদের মধ্যে প্রথম প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়া মনমোহন সিংকে। ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনের আগে অর্থমন্ত্রী ছিলেন ১৯৩২ সালে পাঞ্জাবের এক প্রত্যন্ত অঞ্চলে জন্ম নেওয়া কেমব্রিজ ও অক্সফোর্ডের ডিগ্রিধারী এই অর্থনীতিবিদ। কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স- এর অধীনে দুই মেয়াদে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করা মনমোহন সিং এমন একটি দল রেখে গেছেন যা দেশকে নতুন রূপ দিয়েছে।
তিনি ১৯৯১ সালের অর্থনৈতিক সংস্কারের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ব্যাপকভাবে স্বীকৃত। যা ভারতের বাজারকে বিশ্বায়নের দ্বার উন্মুক্ত করেছিল। লক্ষ লক্ষ মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে এনেছিলেন তিনি। পাশাপাশি দেশকে টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পথে নিয়ে গিয়েছিল।
তার মৃত্যুর সংবাদে বিশ্বজুড়ে নেতারা হৃদয়গ্রাহী বার্তা পাঠিয়েছেন বিভিন্ন মাধ্যমে। এত নেতার শোকবার্তা দেখেই বোঝা যায় তিনি সারা বিশ্ব কতটা জনপ্রিয় ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র সচিব অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেন মনমোহন সিংকে মার্কিন-ভারত কৌশলগত অংশীদারিত্বের “অন্যতম সেরা চ্যাম্পিয়ন” হিসাবে বর্ণনা করেছেন।
মার্কিন-ভারত অসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা চুক্তির অগ্রগতিতে তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরে ব্লিঙ্কেন বলেন, “গত দুই দশকে আমাদের দেশগুলো একসঙ্গে যা অর্জন করেছে তার অনেকটাই মনমোহনের কাজ ভিত্তি স্থাপন করেছে। তার অর্থনৈতিক সংস্কার ভারতের দ্রুত বিকাশকে ত্বরান্বিত করেছে। তার অবদান সর্বদা স্মরণ করা হবে।
“আমরা তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করছি এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করতে তার প্রচেষ্টাকে সবসময় মনে রাখব।”
কানাডার প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী স্টিফেন হারপার গভীর দুঃখ প্রকাশ করে মনমোহন সিংকে ব্যতিক্রমী বুদ্ধিমত্তার অধিকারী, সৎ এবং প্রজ্ঞাবান ব্যক্তি বলে অভিহিত করেছেন।
শোক বার্তায় হারপার আরও বলেন, মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্ব ভারতে এবং আন্তর্জাতিক উভয় ক্ষেত্রেই প্রশংসিত হয়েছিল।
আফগানিস্তানের সাবেক প্রেসিডেন্ট হামিদ কারজাইও শ্রদ্ধা জানিয়েছেন। আফগানিস্তানের প্রতি মনমোহনের অবিচল সমর্থনের কথাও স্মরণ করেছেন তিনি।
“ভারত তার সবচেয়ে বিখ্যাত সন্তানদের একজনকে হারাল। মনমোহন সিং আফগানিস্তানের জনগণের এক অন্যতম বন্ধু ছিলেন। তার মৃত্যুতে আমি গভীরভাবে শোকাহত,” বলেন কারজাই।
মালদ্বীপের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ নাশিদ শোক প্রকাশ করে বলেন, “মনমোহন সিং একজন পরপোকারী এবং নির্ভরযোগ্য ব্যক্তিত্ব।
আমি সবসময় তার সাথে কাজ করতে আনন্দ পেতাম। তাকে সবসময় একজন পরোপকারী পিতৃতুল্য ব্যক্তিত্বের মতো পাশে পেয়েছি। তিনি মালদ্বীপের একজন ভাল বন্ধু ছিলেন।”
রাশিয়াও মনমোহনের মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছে। শোক বার্তায় ভারত-রাশিয়া সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে তার সহায়ক ভূমিকার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
রাশিয়া লিখেছে, “এটি ভারত তথা রাশিয়ার জন্যও অত্যন্ত দুঃখ ও বেদনার মুহূর্ত। আমাদের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে মনমোহনের অবদান ছিল অপরিসীম।”
শান্ত স্বভাব এবং গভীর বুদ্ধিমত্তার মানুষ, মনমোহন সিং তার রাষ্ট্রনায়কত্ব, একাডেমিক সফলতা এবং মানুষের সেবার প্রতি নিজের জীবন উত্সর্গের জন্য সবসময়ই মানুষের মনে গেঁথে থাকবেন।

ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ড. মনমোহন সিংয়ের মৃত্যুতে গভীর শোক ও গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শুক্রবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে শোক প্রকাশের কথা জানানো হয়ে। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ড. মনমোহন সিং প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন। শোক বার্তায় ড. মনমোহনকে সিং একজন নম্র ব্যক্তি, দূরদর্শী নেতা ও রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে বর্ণনা করেছেন ড. ইউনূস। তিনি বলেন, ভারতের জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত করার জন্য তার অটল প্রতিশ্রুতির জন্য পরিচিত ছিলেন ড. মনমোহন সিং। প্রধান উপদেষ্টা বলেন, প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী ভারতের অর্থনৈতিক পরিবর্তনে তার অবদানের জন্য স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। মনমোহন সিংয়ের নেতৃত্ব শুধু ভারতের ভবিষ্যতই গঠন করেনি বরং বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্ধুত্ব ও পারস্পরিক উপকারী সহযোগিতার বন্ধনকে শক্তিশালী করতেও অবদান রেখেছে। আঞ্চলিক সহযোগিতার উন্নয়নে ড. মনমোহন সিংয়ের ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি প্রয়াত মনমোহনের দৃষ্টিভঙ্গি এবং আঞ্চলিক শান্তি, সমৃদ্ধি এবং দক্ষিণ এশীয় সহযোগিতার অগ্রগতিতে ভূমিকার প্রতি দৃঢ় প্রতিশ্রুতি তুলে ধরেন। তিনি দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোকে তার চিন্তাধারার সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার গড়ে তোলার জন্য এবং ড. মনমোহন সিংকে শ্রদ্ধা জানানোর জন্য একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান। প্রধান উপদেষ্টা ড. মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে তার অনেক লালিত ও মূল্যবান স্মৃতি স্মরণ করেন। ২০০৬ সালে নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়া উপলক্ষ্যে মনমোহন সিংয়ের পাঠানো উষ্ণ অভিনন্দন বার্তার কথা উল্লেখ করেন ড. ইউনূস। তিনি ২০০৭ সালের জানুয়ারিতে ড. মনমোহন সিংয়ের সঙ্গে তাঁর বৈঠক এবং ২০০৯ সালের ডিসেম্বরে দ্বিতীয় অধ্যাপক হিরেন মুখার্জি বার্ষিক সংসদীয় বক্তৃতা দেওয়ার জন্য আমন্ত্রণের কথাও স্মরণ করেন। ড. ইউনূস বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের পক্ষ থেকে ড. মনমোহন সিংয়ের পরিবার, সরকার এবং ভারতের জনগণের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছেন।
উল্লেখ্য, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও প্রবীণ কংগ্রেস নেতা ড. মনমোহন সিং ৯২ বছর বয়সে পৃথিবী ছেড়ে না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (২৬ ডিসেম্বর) রাত ৯টা ৫১ মিনিটে নয়াদিল্লির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেসে (এআইআইএমএস) চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই)-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিজ বাড়িতে অসুস্থ হয়ে চেতনা হারান মনমোহন সিং। শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হলে রাত ৮টার দিকে তাকে এআইআইএমএসের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। গুরুতর শ্বাসকষ্ট শুরু হওয়ায় তাকে তৎক্ষণাৎ আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। তবে চিকিৎসকদের চেষ্টার পরও তার চেতনা ফেরানো সম্ভব হয়নি। রাত ৯টা ৫১ মিনিটে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। হাসপাতালের এক বিবৃতিতে জানানো হয়, মনমোহন সিং বয়সজনিত অসুস্থতায় ভুগছিলেন। এর আগে, তিনি বেশ কয়েকটি গুরুতর শারীরিক সমস্যা মোকাবিলা করেছিলেন। ১৯৩২ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর অবিভক্ত পাঞ্জাবের গাহ্ গ্রামে এক শিখ পরিবারে জন্ম নেন মনমোহন সিং। বর্তমান পাকিস্তানের অংশ হওয়া সেই গ্রামে শৈশব কাটালেও দেশভাগের পর তার পরিবার ভারতের অমৃতসরে চলে আসে। ছোটবেলায় মাকে হারিয়ে ঠাকুমার কাছে বড় হন তিনি। প্রথমে উর্দু মিডিয়াম স্কুলে পড়াশোনা শুরু করেন এবং পরবর্তীতে পাঞ্জাবি ও গুরুমুখী ভাষাতেও দক্ষতা অর্জন করেন।
১৯৭১ সালে ভারত সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে মনমোহন সিংয়ের কর্মজীবন শুরু হয়। ১৯৯১ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত তিনি ভারতের অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। তার নেতৃত্বে ভারত অর্থনৈতিক সংস্কারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির সঙ্গে আরও দৃঢ়ভাবে যুক্ত হয়।
২০০৪ সালে কংগ্রেস জোটের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে মনমোহন সিং ভারতের ১৪তম প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। দুই মেয়াদে (২০০৪-২০১৪) প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে ভারতের অর্থনীতি শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছায়। তথ্যপ্রযুক্তি খাতের অগ্রগতি এবং বিভিন্ন সামাজিক উন্নয়নমূলক প্রকল্প তার শাসনামলের উল্লেখযোগ্য অর্জন।
চলতি বছরের শুরুর দিকে রাজ্যসভা থেকে অবসর নেন মনমোহন সিং। এর আগে, ২০০৯ সালে তার সফল করোনারি বাইপাস সার্জারি সম্পন্ন হয় এবং ২০২১ সালে তিনি কোভিড-১৯-এ আক্রান্ত হন। তবে এসব শারীরিক সমস্যা কাটিয়ে তিনি দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিলেন।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply