বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৭:১৪ অপরাহ্ন
ইউনিভার্সেল নিউজ ডেস্ক : বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, বেশ কিছু বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকার নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করতে পারছে না। আমি এ কথা গতকালও বলেছি। অন্তর্বর্তী সরকার যদি নিরপেক্ষ না থাকে, তাহলে একটা নিরপেক্ষ সরকার দরকার হবে নির্বাচনের সময়ে। আমি যে কথাটা বলছি, এর কারণ আছে। কারণ হচ্ছে, আমরা দেখছি যে বেশ কিছু বিষয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিরপেক্ষতা পালন করতে পারছেন না। বৃহস্পতিবার (২৩ জানুয়ারি) দুপুরে জাতীয় প্রেসক্লাবে শহীদ আসাদ পরিষদের উদ্যোগে ’৬৯–এর গণ-অভ্যুত্থানের নায়ক শহীদ আসাদের ৫৬তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে এক আলোচনা সভায় মির্জা ফখরুল ইসলাম এ কথাগুলো বলেন।
সরকারের উদ্দেশে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমি অনুরোধ করব, আমি প্রত্যাশা করব, আমি আশা করি যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সেই নিরপেক্ষতা পালন করবেন এবং দেশে যে সংকট আছে, সেই সংকট থেকে দেশকে মুক্ত করবার জন্য তারা কাজ করবেন।’
তবে অন্তর্বর্তী সরকার কোন কোন বিষয়ে নিরপেক্ষতা পালন করতে পারছেন না, তা খোলাসা করেননি মির্জা ফখরুল। বুধবার বিবিসি বাংলাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বৃহস্পতিবার বিষয়টি নিয়ে আবার বক্তব্য দেন।
কেন তারা দ্রুত জাতীয় নির্বাচন চাইছেন, তার ব্যাখ্যা দিয়ে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘একটা কথা আমি বলি, যে কথা বললে পরে আমার সমালোচনাও হয়। আমি বলি নির্বাচনটা দ্রুত হওয়া দরকার। এই কথাটা আমি বারবার বলার চেষ্টা করেছি যে নির্বাচন থেকে আমরা ১৫ বছর বঞ্চিত। এই নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণ তাদের প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করার একটা সুযোগ পাবে। আপনারা দেখছেন, জোর করে সেই বিষয়টাকে যদি বিতর্কিত করে ফেলা হয়, তাহলে তো জনগণ আবার সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আমাদের অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি, নির্বাচন যদি দ্রুত না হয়, সময় ক্ষেপণ করা হয়, তাহলে অন্যান্য শক্তিগুলো মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে থাকে। তখন জনগণের যে চাহিদা, সেই চাহিদা থেকে তারা পুরোপুরিভাবেই বঞ্চিত হয়।’
এ প্রসঙ্গে বিএনপির শীর্ষ এই নেতা বলেন, ‘আমরা এ কথাটা বারবার বলতে চাই, নির্বাচনে কে আসবে সেটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা লড়াই করেছি দীর্ঘ ১৫ বছর। বর্তমান যে অন্তর্বর্তী সরকার আছে, সেই সরকারের কাছে আমাদের প্রত্যাশা অনেক। স্বাভাবিকভাবে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পরেই জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, এখন পর্যন্ত সমাজের যে অবস্থা দাঁড়িয়েছে, সেই অবস্থায় আমরা এখনো নিশ্চিত হতে পারছি না যে দেশের মানুষের প্রত্যাশাগুলো পূরণ হবে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, প্রত্যেকটা রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন রকম কর্মসূচি আছে। সেই কর্মসূচি নিয়ে তারা এগোতে চায়। তবে একটা বিষয়ে সবাই একমত, একটা নির্বাচন হওয়া দরকার। নির্বাচনটা শুধু একটা দলকে ক্ষমতায় বসানোর জন্য নয়, নির্বাচনটা হচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যাওয়ার জন্য একটা পথ সৃষ্টি করা, একটা দরজা খোলা। তিনি বলেন, ‘আজকে প্রশ্ন উঠছে যে সবগুলো সংস্কার করে নির্বাচনে যাওয়া। তাহলে কি আমরা চার-পাঁচ বছর ধরে অপেক্ষা করব? বা যত দিন সংস্কার সম্পন্ন না হয়, তত দিন ধরে অপেক্ষা করবে জনগণ?’
ফখরুল বলেন, ‘আমরা এখনো দেখছি, আমাদের আমলাতন্ত্রে আগের যে ব্যবস্থা ছিল, সেই ব্যবস্থায় তারা এখনো সচিবালয় থেকে শুরু করে সমস্ত প্রশাসনে একইভাবে ভূমিকা পালন করছে, কোনো রদবদল হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে লেখাপড়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। স্কুল-কলেজগুলোতে সেই ধরনের লেখাপড়া হয় না। স্বাস্থ্য ব্যবস্থা প্রায় ভেঙে পড়েছে, এটা অতীত থেকেই এসেছে এবং সেই পরিবর্তন এত অল্প সময়ে সম্ভবও নয়, কিন্তু আমরা সেই পরিবর্তনগুলো চাই।’
বিএনপির মহাসচিব বলেন, ‘সেই কারণে আমরা বলেছি যে নির্বাচনটা দ্রুত হওয়া দরকার। নির্বাচন দ্রুত হলে যে দল ক্ষমতায় আসবে জনগণের প্রতি তার যে রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি থাকবে, সেই প্রতিশ্রুতি পালন করার জন্য অবশ্যই তারা দায়বদ্ধ থাকবে।’
মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা যারা একসঙ্গে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিরুদ্ধে যুগপৎ আন্দোলন করছিলাম, আমরা ৩১ দফা কর্মসূচি দিয়েছি। এখন যদি কোনো পরিবর্তন করতে হয়, পরিবর্ধন করতে হয় সেটাও সামনে আসতে পারে। ওটাকে সামনে রেখেই আমাদের এগোতে হবে। আমি মনে করি, আমাদের এই ন্যূনতম যে সংস্কার হচ্ছে নির্বাচনকেন্দ্রিক, সেই সংস্কার শেষ করে আমাদের অতি দ্রুত নির্বাচনের পথে যাওয়া উচিত। এবং নির্বাচনের মধ্য দিয়ে যে সরকার বেরিয়ে আসবে তাদের দায়িত্ব হবে সংস্কারের যে কমিটমেন্ট (অঙ্গীকার) আছে, সেই কমিটমেন্টগুলো বাস্তবায়িত করা।’
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘আসাদের রক্তকে, আবু সাঈদের রক্তকে আমরা বৃথা যেতে দিতে পারি না। সে জন্য আমাদের ঐক্য গড়ে তুলে তাদের (শহীদদের) স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করতে হবে, এই হোক আজকের প্রতিজ্ঞা।’
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক মাহবুব উল্লাহর সভাপতিত্বে ও ভাসানী অনুসারী পরিষদের সদস্যসচিব হাবিবুর রহমানের সঞ্চালনায় আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন বিএনপির উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আমানউল্লাহ আমান, জহির উদ্দিন স্বপন, যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকন, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) একাংশের সভাপতি খন্দকার লুৎফুর রহমান, আরেক অংশের সাধারণ সম্পাদক আসাদুর রহমান খান, শহীদ আসাদের ছোট ভাই আজিজুল্লাহ এম নুরুজ্জামান প্রমুখ।
অপরদিকে, বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নিরপেক্ষ সরকারের দাবি মূলত আরেকটি এক এগারো সরকার গঠনের ইঙ্গিত বহন করে এমন মন্তব্য করেছেন অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেছেন, বিএনপি কয়েক দিন আগে ‘মাইনাস টুর’ আলোচনা করলেও এখন ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করার জন্য নিরপেক্ষ সরকারের নামে আরেকটি এক-এগারো সরকারের প্রস্তাব করছে। এ ধরনের পরিকল্পনা গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবে এবং ছাত্র-জনতা কোনোভাবেই এটা মেনে নেবে না। এটা বিএনপির বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র। বৃহস্পতিবার (২৩ জানুয়ারি) বিকেলে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে এসব কথা বলেছেন তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম। এর আগে গত মঙ্গলবার বিবিসি বাংলাকে দেওয়া একান্ত সাক্ষাৎকারে এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘যদি অন্তর্বর্তী সরকার পূর্ণ নিরপেক্ষতা পালন করে, তাহলেই তারা নির্বাচন কন্ডাক্ট (পরিচালনা) করা পর্যন্ত থাকবে। তা না হলে তো নিরপেক্ষ সরকারের প্রয়োজন হবে।’
বিএনপির মহাসচিবের ওই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে লেখা স্ট্যাটাসে উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম ফেসবুকে বলেছেন, ‘ছাত্র এবং অভ্যুত্থানের নেতৃত্বকে মাইনাস করার পরিকল্পনা ৫ আগস্ট থেকেই শুরু হয়েছে। ৫ আগস্ট যখন ছাত্র-জনতা রাজপথে লড়াই করছে, পুলিশের গুলি অব্যাহত রয়েছে, তখন আমাদের আপসকামী অনেক জাতীয় নেতা ক্যান্টনমেন্টে জনগণকে বাদ দিয়ে নতুন সরকার করার পরিকল্পনায় ব্যস্ত ছিলেন (অনেকে ছাত্রদের কথাও বলেছেন সেখানে)। আমরা ৩ আগস্ট থেকে বলে আসছি, আমরা কোনো প্রকারের সেনাশাসন বা জরুরি অবস্থা মেনে নেব না। আমাদেরকে বারবার ক্যান্টনমেন্টে যেতে বলা হলেও আমরা যেতে অস্বীকার করি। শেষ পর্যন্ত বঙ্গভবনে আলোচনা ও বার্গেনিংয়ের (দর–কষাকষি) মাধ্যমে অধ্যাপক ইউনূসকে প্রধান করে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের সিদ্ধান্ত হয়।’
নাহিদ লেখেন, ‘আমরা চেয়েছিলাম ফ্যাসিবাদবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে একটা জাতীয় সরকার। জাতীয় সরকার হলে ছাত্রদের হয়তো সরকারে আসার প্রয়োজন হতো না। জাতীয় সরকার অনেক দিন স্থায়ী হবে এই বিবেচনায় বিএনপি জাতীয় সরকারে রাজি হয়নি। কিন্তু অভ্যুত্থানের পরেই দেশে জাতীয় সরকারের প্রয়োজনীয়তা সবচেয়ে বেশি ছিল। অথচ বিএনপি জাতীয় সরকারের কথা বলছে সামনের নির্বাচনের পরে। ছাত্ররাই এই সরকার এবং বিদ্যমান বাস্তবতার একমাত্র ফ্যাক্টর, যেটা এক-এগারোর সরকার থেকে বর্তমান সরকারকে সম্পূর্ণভাবে আলাদা করে। বিএনপি কয়েক দিন আগে ‘‘মাইনাস টুর’’ আলোচনা করলেও এখন ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করার জন্য নিরপেক্ষ সরকারের নামে আরেকটি এক–এগারো সরকারের প্রস্তাবনা করছে। এ ধরনের পরিকল্পনা গণতন্ত্র ও জাতীয় স্বার্থের বিরুদ্ধে যাবে এবং ছাত্র-জনতা কোনোভাবেই এটা মেনে নেবে না। আমি মনে করি, এটা বিএনপির বিরুদ্ধেও ষড়যন্ত্র।’
উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম লিখেছেন, ‘অন্তর্বর্তী সরকার জাতীয় সরকার না হলেও সরকারে আন্দোলনের সব পক্ষেরই অংশীদারত্ব রয়েছে এবং সব পক্ষই নানা সুবিধা ভোগ করছে। সরকার গঠনের আগেই ৬ আগস্ট অ্যাটর্নি জেনারেল এবং পুলিশের আগের মহাপরিদর্শক নিয়োগ হয়েছিল, যাঁরা মূলত বিএনপির লোক। এ রকমভাবে সরকারের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত নানা স্তরে বিএনপিপন্থী লোকজন রয়েছে। নির্বাচনের নিরপেক্ষতার কথা বললে এই বাস্তবতাও মাথায় রাখতে হবে। রাষ্ট্রপতির পরিবর্তন, সংস্কার, নতুন সংবিধান, জুলাই ঘোষণা সব ইস্যুতেই বিএনপি বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। অথচ এগুলোর কোনোটাই ছাত্রদের দলীয় কোনো দাবি ছিল না। কিন্তু দেশের স্থিতিশীলতা, বৃহত্তর স্বার্থ এবং জাতীয় ঐক্য ধরে রাখার জন্য ছাত্ররা বারবার তাদের অবস্থান থেকে সরে এসেছে। কিন্তু এর মানে এই নয় যে গণতন্ত্রবিরোধী ও অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষাবিরোধী কোনো পরিকল্পনা হলে সেখানে আমরা বিন্দু পরিমাণ ছাড় দেব।’
নাহিদ ইসলাম আরও লেখেন, ‘আওয়ামী লীগ বিষয়ে ভারতের প্রধান দলগুলোর মধ্যে ঐক্য সম্ভব হয়েছে, অথচ বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ বিষয়ে আমরা ঐক্য করতে পারিনি এত হত্যা এবং অপরাধের পরেও। হায় এই “জাতীয় ঐক্য” লইয়া আমরা কী রাষ্ট্র বানাব! বাংলাদেশকে দুর্বল করা সহজ, কারণ বাংলাদেশকে সহজেই বিভাজিত করা যায়। এ দেশের বড় বড় লোকেরা অল্প মূল্যে বিক্রি হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে। আমি মনে করি না, সমগ্র বিএনপি এই অবস্থান (মির্জা ফখরুলের বক্তব্য) গ্রহণ করে। বরং বিএনপির কর্মী–সমর্থকদের বড় অংশই অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার বাস্তবায়ন চায়। বিএনপির দেশপ্রেমিক ও ত্যাগী নেতৃত্বকে আহবান করব, ছাত্র–জনতার অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে না গিয়ে ছাত্র-জনতার সঙ্গে বৃহত্তর ঐক্য ও সংহতির পথ বেছে নিন।’
এদিকে বিবিসি বাংলাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বিএনপির মহাসচিব আরও বলেছিলেন, ‘(সরকারের) নিরপেক্ষতার প্রশ্ন আসতে পারে। কেননা, এখানে আমরা লক্ষ করছি যে ছাত্ররা একটা রাজনৈতিক দল তৈরি করার কথা চিন্তা করছেন। সেখানে যদি ছাত্রদের প্রতিনিধি এই সরকারে থাকে, তাহলে তো নিরপেক্ষ থাকতে পারবে না। ওইটা হচ্ছে, সম্ভাব্য কথা। কিন্তু যদি তারা মনে করে যে (সরকারে) থেকেই তারা নির্বাচন করবে, তাহলে তো রাজনৈতিক দলগুলো মেনে নেবে না।’
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
Leave a Reply