বৃহস্পতিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২৬, ০৪:০১ অপরাহ্ন
ইউনিভার্সেল নিউজ : বরিশালের মেহিন্দগঞ্জ উপজেলার উত্তর উলানিয়ায় পূর্বহর্নি নূরে মদিনা জামে মসজিদের স্বঘোষিত সম্পাদক আব্দুল মান্নান মাঝির বিরুদ্ধে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া তার বিরুদ্ধে এলাকার শান্তিপ্রিয় মানুষের রয়েছে বিস্তর অভিযোগ। একের পর এক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড করে আসলেও তাকে কখনোই কোন শাস্তি পোহাতে হয়নি। এর ফলে আরো বেপরোয়া হয়ে একের পর এক অন্যায়-অপকর্ম চালিয়ে আসছেন তিনি। এলাকার সাধারন মানুষ তার বিরুদ্ধে মুখ খুলতে ভয় পাচ্ছেন। কেউ তার অপকর্মের প্রতিবাদ করলে প্রতিবাদকারীকে উল্টো ফাঁসিয়ে দিয়ে হেনস্থা করা হচ্ছে। গ্রামে শান্তি শৃঙ্খলা বিনষ্টকারী মসজিদ ও কবরস্থানের অর্থ লুণ্ঠনকারী আব্দুল মান্নান মাঝির সহযোগীরা হলেন মহিউদ্দিন বাঘা, আলাউদ্দিন মাঝি, জাকির মাঝি, ইসমাইল আকন, মতিন মাঝী ও কাদের দেওয়ান প্রমুখ। এলাকার সচেতনমহল আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর আশু দৃষ্টি কামনা করে বলছেন, মসজিদের অর্থ আত্মসাৎকারী বহু অপকর্মের অনুঘটক মান্নান মাঝি ও তার সহযোগীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার উত্তর উলানিয়ার পূর্বহর্নি গ্রামে উলানিয়া পাতারহাট মেইন রোড সংলগ্ন নুরে মদিনা জামে মসজিদটি অবস্থিত। যা ৬০ এর দশক হতে বাঘা মসজিদ নামে পরিচিত ছিল। এই পাঞ্জেগানা মসজিদটি ২০১৪ সালে দাতা মোঃ ইসমাইল হোসেন এর জমি প্রদানের মধ্য দিয়ে জুম্মা মসজিদে রুপান্তর করে পূর্বহর্নি নূরে মদিনা জামে মসজিদ নামে নামকরণ করা হয়। পরবর্তীতে আরও কয়েকে জন জমি দান করেন। প্রতিষ্ঠাকালীন সময়ে সভাপতি ছিলেন জাকির হোসেন মাষ্টার ও আব্দুল মান্নান মাঝি। অভিযোগ রয়েছে-মসজিদটি রুপান্তরের সময় দেশি-বিদেশি বিপুল পরিমাণ দান অনুদান এর অর্থ আব্দুল মান্নান মাঝি কমিটির অন্য সদস্যদের মতামতকে উপেক্ষা করে কোন প্রকার রেজুলেশনের তোয়াক্কা না করে খেয়াল খুশি মতো খরচ করেন। যার প্রেক্ষিতে তার বিরুদ্ধে তহবিল জালিয়াতির অভিযোগ উঠে। এরপর মসজিদের সভাপতি হিসাব চাইলে তাকে স্থানীয় উলানিয়া বাজারে প্রকাশ্য জনসম্মুখে তিনি ও তার পোষা গুণ্ডা বাহিনী দিয়ে পরিধেয় বস্ত্র খুলে নির্মমভাবে মারধর করেন। এভাবে পরবর্তীতে একে একে সাবেক কোষাধ্যক্ষ শফিক খান, মুসল্লি আ: রব মাঝি, পরিচালনা কমিটির সদস্য সালাউদ্দিন হিরু, দুলাল হাওলাদারসহ আরও অনেককে তৎকালীন সময়ে রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় গুণ্ডা বাহিনী দিয়ে মারধরের হুমকি প্রদান করে মসজিদ থেকে বিতাড়িত করেন।
এমন পরিস্থিতিতে ২০২২ সালে মসজিদে ব্যাপক বিশৃঙ্খলা ও জনরোষ তৈরি হলে মসজিদের জমি দাতার বড় ছেলে আইনজীবী মোঃ আমজাদ হোসেন ফিরোজ বিষয়টি এলাকার চেয়ারম্যানের দৃষ্টিগোচর করলে তিনি মুসল্লি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে মসজিদে ব্যাপক আলোচনা শেষে সর্বসম্মতিতে বীর মক্তিযোদ্ধা আলী আহাম্মদ রাড়ীকে সভাপতি ও মাও: নাছির উদ্দিন মাষ্টারকে সম্পাদক করে নতুন কমিটি করা হয়। কিন্তু এখানেও তিনি প্রভাব বিস্তার করে গুণ্ডা বাহিনী দিয়ে সম্পাদক পদ থেকে নাছির উদ্দিনকে সরিয়ে দিয়ে নিজেই স্বঘোষিত সম্পাদক হয়ে বিগত দুই বছর সভাপতিকে একদিনের জন্যও কাজ করতে দেননি। বিভিন্ন সময়ে মসজিদের হিসাব চাইতে গেলে সভার মধ্যেই সভাপতিকে গালিগালাজ ও মারতে উদ্যত হন। তিনি মসজিদের সম্মানিত দাতা মো: ইসমাইল হোসেনকেও একাধিকবার গালিগালাজ ও মারধর করেত উদ্যত হন। সূত্রগুলোর ভাষ্য, আব্দুল মান্নান মাঝি কবরস্থান ও মসজিদের প্রায় দশ লাখ টাকার অধিক তহবিল আত্মসাৎ করেছেন। হিসাবে বসলে তাকে ওই টাকা পরিশোধ করতে হবে, এজন্য তিনি হিসাব দিতে গড়িমসি করছেন। এরকম কর্মকাণ্ডে অনেকে মসজিদে আসা ছেড়ে দিয়েছেন। স্থানীয়রা বলছেন, যে মান্নান মাঝি গরীব ও দিন মজুর ছিলেন, তিনি এত সম্পদ গড়েছেন এর উৎস কি?
এলাকায় নানা শ্রেনী পেশার মানুষের মুখে মুখে চাউর আছে- তিনি স্থানীয় নদী দস্যুতা, ডাকাতি, চর দখল, মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন। ২০২১ সালের দিকে সরকারি পল্লী বিদ্যুত চুরির বিষয়টি এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে তিনি পল্লী বিদ্যুত অফিসে প্রায় ৩ লাখ টাকা জরিমানা দেন। তিনি গর্ব করেই সকলের নিকট বলেন এ সব জরিমানায় আমার কিছুই আসে যায় না, আমার টাকা আছে না! এছাড়াও ছাগল চুরি, ইরি মেশিনের তেল চুরি, নারী ধর্ষণ ও পশুর সাথে যৌনতারও অভিযোগ রয়েছে মান্নান মাঝির বিরুদ্ধে।
স্থানীয়ভাবে মান্নান মাঝির দখলবাজীতে স্থানীয় নোয়ারাজা সরদারের বংশধর ভিটামাটি হারা হয়েছেন। যার সাথেই তার জমির সীমানা রয়েছে, তিনি তার পাশের জমির সীমানা পিলার ফেলে দিয়ে দখল করে নিয়েছেন। সূত্র জানায়, কিছুদিন আগে স্থানীয় রফিক মাঝির বাগানের সুপারি চুরি হলে তা তার ঘর থেকে উদ্ধার হয়। সকল অপকর্মের জন্য মানসম্মান নষ্টের কথা জানিয়ে আপন শ্যালক মোস্তাফিজুর রহমান সুমন ও ছাদেকুর রহমান তার সাথে কথা বলতে গেলে স্থানীয় উলানিয়া বাজারে তিনি নিজে উপস্থিত থেকে পালিত গুণ্ডা বাহিনী দিয়ে মারধর করেন এবং এ বিষয়ে কথা বললে তাদেরকে প্রাণে মেরে ফেলবেন বলে হুমকি দেন।
এদিকে, গত ৮ নভেম্বর শুক্রবার জুম্মাবাদ মসজিদের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে মান্নান মাঝি আবারও ৫০/৬০জন বহিরাগত সন্ত্রাসী ভাড়ায় এনে নতুন কমিটি গঠনে বিশৃঙ্খলা তৈরি ও মুসল্লী জহির রাড়ীকে মারধর করে তার পাঞ্জাবী ছিঁড়ে ফেলেন।
এসব প্রসঙ্গে বীর মক্তিযোদ্ধা আলী আহাম্মদ রাড়ী ইউনিভার্সেল নিউজকে বলেন, এলাকায় চরম ধুরন্ধর প্রকৃতির লোক আব্দুল মান্নান মাঝি। বার বার হিসাব চাওয়ার পরও পূর্বহর্নি নূরে মদিনা জামে মসজিদের আয় ব্যয়ের কোন হিসাব দিতে পারেননি তিনি। মসজিদের নামে উত্তোলন বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ করার পাশাপাশি এলাকায় বিভিন্ন ধরণের অন্যায় অপকর্মের সঙ্গে জড়িত এই মন্নান মাঝি। তার বিরুদ্ধে এলাকাবাসীর রয়েছে অন্তহীন অভিযোগ। কেউ প্রতিবাদ করলে প্রতিবাদকারীদের উল্টো গুণ্ডা ভাড়া করে এনে হেনস্থা করাচ্ছে। মান্নানের কারনে এলাকার পরিবেশ দূষিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন বীর মক্তিযোদ্ধা আলী আহাম্মদ রাড়ী।
মসজিদের মুসল্লি জহির রাঢ়ী ইউনিভার্সেল নিউজকে বলেন, বিভিন্ন ব্যক্তিবর্গের দানে পূর্বহর্নি নূরে মদিনা জামে মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মসজিদ প্রতিষ্ঠার পর থেকে দান-অনুদানের টাকা আত্মসাতের লক্ষে মান্নান মাঝি নানান কায়দায় প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। আজ পর্যন্ত মসজিদ ফান্ডের কোন হিসেব দিতে পারেননি তিনি। সন্ত্রাসীদের ব্যবহার করে মসজিদের পদ দখলে রাখতে গিয়ে এই মান্নান মাঝি বিতর্কের কালো অধ্যায় সৃষ্টি করেন। কেউ তার অন্যায়-অনিয়মের প্রতিবাদ করলে তিনি ভাড়ায় সন্ত্রাসী এনে প্রতিবাদী ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে নির্যাতন চালিয়ে আসছেন। এলাকার বিভিন্ন গণমান্য ব্যক্তিদের তিনি অপমান-অপদস্ত ও নির্যাতন করেছেন। মসজিদে একক আধিপত্য বিস্তারের ক্ষেত্র তৈরিতে সন্ত্রাসী ব্যবহার করাটা কতটা জঘন্য এ প্রতিবদকে এরকম প্রশ্ন রেখে মুসল্লি জহির বলেন, মান্নান মাঝির অপকর্মের শেষ নেই। এমন কোন অপকর্ম নেই যা তিনি করেননি। মসজিদকে তিনি নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে মনে করে যা ইচ্ছে তাই করে চলছেন। স্থানীয় গন্যমান্য ব্যক্তি জাকির মাস্টার, শফিক খান সহ বেশ কয়েকজনকে লাঞ্ছিত করে কমিটি থেকে বিতাড়িত করেছেন। আওয়ামী লীগের গুণ্ডা বাহিনী দিয়ে নাছির মাওলানাকে মারধর করে বিতাড়িত করেছেন তিনি। সম্প্রতি জুম্মাবাদ মসজিদের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে মান্নান মাঝি ভাড়ায় সন্ত্রাসী এনে নতুন কমিটি গঠনে বিশৃঙ্খলা তৈরি করেছে। এবং আমাকে মারধর করতে করতে পাঞ্জাবী ছিঁড়ে ফেলা হয়। এলাকার অসংখ্য অপকর্মের হোতা মসজিদের অর্থ আত্মসাতকারী মান্নান মাঝিকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নির্যিতিত মুসল্লি জহির রাঢ়ী।
মান্নান মাঝির বিভিন্ন অপকর্মের বিষয়ে সতত্যা স্বীকার করে শ্যালক মোস্তাফিজুর রহমান সুমন ইউনিভার্সেল নিউজকে বলেন, পারিবারিকভাবে ভগ্নিপতি মান্নান মাঝির সাথে আমাদের সম্পর্ক ভালো না। কারণ হিসেবে বলেন, এলাকায় বিভিন্ন ধরণের অন্যায় কাজের সঙ্গে তিনি জড়িত। সম্প্রতি মান্না মাঝি কর্তৃক সুপারি চুরি এবং প্রতিবাদ করলে গুণ্ডা ভাড়ায় এনে মারধর প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এরকম কিছু ঘটনা ঘটেছে। তবে ওটা সুপারী চুরি নয়, পারিবারিক বিষয় ছিলো বলে মন্তব্য করে সুমন বলেন, এ বিষয়টি আমার ভাই ভালো বলতে পারবে। তিনি আরো বলেন, পরে আপনার সাথে এ বিষয়ে বিস্তারিত কথা বলব।
সকল অভিযোগ মিথ্যা-বানোয়াট-ষড়যন্ত্রমূলক উল্লেখ করে আব্দুল মান্নান মাঝি ইউনিভার্সেল নিউজকে বলেন, অনেক কষ্ট করে আমি মসজিদ প্রতিষ্টা করেছি। এই মসজিদে সবার চেয়ে আমার অবদান বেশি। এলাকায় যাদেরকে মুসল্লিরা চায় না তারাই আমার বিরুদ্ধে বিভিন্ন রকম ষড়যন্ত্র করে আসছে। তিনি বলেন, আমার কোন বাহিনী নেই, আমি কাউকে মারধর কিংবা অপমান-অপদস্ত করিনি। মসজিদের অর্থ আত্মসাৎ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মসজিদের টাকা আত্মসাতের প্রশ্নই আসে না। তিনি আরো বলেন, মসজিদের মুসল্লিরা আমাকে জোরপূর্বক সম্পাদক পদে রেখেছে।
© All rights reserved ©2022-2026 universalnews24.comDesign By Ahmed Jalal.
ধন্যবাদ আপনাদের জন্য্য।